নীড় পাতা / ফিচার / অরণ্যসুন্দরী / বাণিজ্যিকায়নের কাছে জিম্মি রাঙামাটি শহর ও কাপ্তাই হ্রদ

বাণিজ্যিকায়নের কাছে জিম্মি রাঙামাটি শহর ও কাপ্তাই হ্রদ

কখনো ক্লিন, রাঙামাটি আবার কখনো গ্রীন রাঙামাটি, পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাঙামাটি কিংবা সবুজের রাঙামাটি। আবার সেইভ দি কাপ্তাই লেক কিংবা ক্লিন কাপ্তাই লেক। এধরনের একাধিক সামাজিক আন্দোলন রাঙামাটিবাসীর কাছে এখন খুব পরিচিতি। প্রিয় শহর রাঙামাটিকে সবুজের রাঙামাটি কিংবা পরিচ্ছন্ন রাঙামাটি হিসাবে দেখার যে স্বপ্ন রাঙামাটিবাসীর মনে লালায়িত কিংবা দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদকে একটি দূষণমুক্ত হ্রদ হিসাবে দেখার লালায়িত স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন পূরণে যখন যে নামেই এসব সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন সেসব আন্দোলনে রাঙামাটির সচেতন মহল ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কিন্ত ফলাফলের খাতায় অর্জিত মার্ক যখন শূন্য থেকে যায় কিংবা অনেক ক্ষেত্রে মাইনাস থাকে তাহলে সহজেই বুঝা যায় কি ধরনের বেদনায় ভূগছেন রাঙামাটির সচেতন মহল।

রাঙামাটিকে বলা হয় দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শহর। শহরের মূল বৈশিষ্ট্য এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। প্রকৃতির অসংখ্য বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, ছোট বড় উঁচু-নিচু পাহাড় এবং পাহাড়ের তল দেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলধারার কাপ্তাই হ্রদের অপরূপ সৌন্দর্য রাঙামাটির মূল বৈশিষ্ট্য। আর প্রকৃতির শোভামন্ডিত এই সৌন্দর্য আকৃষ্ট করে দেশ বিদেশের অসংখ্য পর্যটকদের। তবে সময়ের আবর্তে এখন সবকিছু যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

আগে যেখানে মানিকছড়ি দিয়ে মূল রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়তো পাহাড় আর গাছ-গাছালি। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে দূর থেকে কাপ্তাই হ্রদের জল দেখা যেত। এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। মানিকছড়ির পাহাড়ি উঁচু রাস্তা দিয়ে মূল রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে অসংখ্য ন্যাড়া পাহাড়। পাহাড়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। এসবের ফাঁকে কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশির দূরবর্তী দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। আর রাঙামাটি শহওে প্রবেশ করার পর মনে হবে এ যেন একটি অপরিকল্পিত শহর। অনেকের কাছে রাঙামাটি এখন বস্তির শহরে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রধান একটি পর্যটন শহর এভাবে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠতে পারে তা অনেকের কাছে অবিশ^াস্য।

আয়তনের দিক দিকে রাঙামাটি জেলা বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ জেলা হলেও মূল রাঙামাটি শহর অনেক ছোট। বলা যায় যদি ভেদভেদী থেকে রাঙামাটির মূল শহর শুরু হয় তাহলে একদিকে রিজার্ভ বাজারের লঞ্চ ঘাট, একদিকে জেলা প্রশাকের ডাক বাংলো এবং অপর দিকে পর্যটন কর্পোরেশন এর ঝুলন্ত সেতু এলাকা। এঁটাই মূল রাঙামাটি শহর। মাঝখানে অনেক লোকালয় থাকলেও মূল সড়কের দূরবর্তী অবস্থানে থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এসব এলাকা কাছে থেকেও দূরে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সদ্য বিদায়াী জেলা প্রশাসক মোহাস্মদ মানজারুল মান্নান রাঙামাটি শহরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে বলেছিলেন রাঙামাটি শহর সম্ভবত দেশের সবচাইতে অপরিছন্ন শহর। শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে নিয়োজিত কর্র্তৃপক্ষসমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবের কারণে রাঙামাটি শহরের এই করুণ অবস্থা। অপর দুই পার্বত্য জেলা শহর এক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে থাকলেও আমাদের পশ্চাদপদতা আমাদেও দুঃখ দেয়। রাঙামাটির জেলা প্রশাসকের দায়িত্বভার অর্পণের একদিন আগেও তিনি রাঙামাটির সুশীল সমাজ এবং সংবাদকর্মীদের আহবান জানিয়েছেনে সকলে মিলে যাতে কাপ্তাই হ্রদকে রক্ষা করা হয়।

ভৌগলিকগত অবস্থানের কারণে রাঙামাটি শহরের মূল অবস্থান গড়ে উঠেছে কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী এলাকায়। রাঙামাটি শহরের আভ্যন্তরিণ এলাকায় যেসব জাতীয় সড়ক কিংবা আভ্যন্তরিণ সড়ক রয়েছে সেগুলোও বাস্তবতার কারণে সুপরিসর নয়। একই কারণে রাঙামাটির সড়কগুলোর দু’পাশে ফুটপাত করা যায় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। ফলে রাঙামাটিতে যানবাহন এবং পথচারীদের চলাচল অনেকটা এক সাথেই হয়। আবার গৃহস্থলী কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহৃত বর্জ্যগুলোও ফেলা হয় সড়কের পাশে কিংবা সরাসরি কাপ্তাই হ্রদে।

রাঙামাটি শহরে ফুটপাত বলতেই বুঝা যায় কাঁঠালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর সামনে হতে রাঙামাটি জেলা জেনারেল হাসপাতাল পর্যন্ত প্রবেশ মূখের সড়কের দু’পাশের এলাকা সমূহকে। তবে এসব ফুটপাতের এখনকার দৃশ্য দেখলে বুঝা যাবে না এগুলো কি পথচারীদের চলাচলের জন্য নাকি ভ্রাম্যমান হাট বাজারের জন্য? বনরূপা এলাকার মূল ফুটপাতগুলো এখন ভ্রাম্যমান বিক্রেতাদের দখলে। সম্প্রতি বনরূপা বাজারের আভ্যন্তরীণ সড়কসমূহের উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ায় বনরূপা বাজারের ভ্রাম্যমান শাকসব্জির বাজার এবং মাছের বাজারও ঠাঁই পেয়েছে বনরূপার দু’পাশের ফুটপাতগুলোতে। ফলে এখন আর পথচারীদের ফুটপাতে চলাচলের কোন সুযোগ নেই। আবার অনেক জায়গায় ফুটপাতের জায়গা সংকুলান না হওয়াতে অনেকে মূল রাস্তার পাশে তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। রাঙামাটির মূল সড়কের পাশে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেদিকে কারো কোন নজর নেই। সাময়িক সময়ের জন্য বনরূপার ফুটপাতগুলোতে ভ্রাম্যমান সব্জি এবং মাছের বাজার বসলেও ভবিষ্যতে আদৌ এগুলো সরানো হবে কিনা সে বিষয়ে অনেকে এখন থেকেই শংকিত। কেননা রাঙামাটি সরকারি কলেজের সামনের ফুটপাতগুলোতে যেভাবে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করে ফুটপাতগুলোতে দখল করা হয়েছে তাতে এই শংকা অমূলক কিছুই নয়। পাশাপাশি ইদানিং রাঙামাটি শহরের মূল সড়কের দু’পাশে যেভাবে বাজারের আগ্রাসন দেখা যাচ্ছে তাতে রাঙামাটি শহর এর ভবিষ্যৎ কি হতে পারে সেদিকেও অনেকে চিন্তিত।

সড়কগুলোর দুপাশের বেহাল অবস্থার পাশাপাশি রাঙামাটি শহরের চারিদিকে বয়ে যাওয়া কাপ্তাই হ্রদের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের মতে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ এখন রাঙামাটির আবর্জনা ফেরার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে হ্রদের দু’পাশ দখল অপর দিকে হ্রকে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করার কারণে কাপ্তাই হ্রদকে এখন দূষণের হ্রদ হিসাবে পরিগণিত করা হচ্ছে। অনেকর ধারণা সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন কাপ্তাই হ্রদের পানি এতটাই দূষিত হয়ে পড়বে যে ঘোষণা দিতে হতে কাপ্তাই হ্রতের পানি ব্যবহারের অযোগ্য। কাপ্তাই হ্রদের পানি বুড়িগঙ্গার মতোই দূষিত হয়ে পড়বে। রাঙামাটিবাসীর পানির প্রধান উৎস কাপ্তাই হ্রদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

ফিরে আসি আগের কথায় রাঙামাটি শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার মানসে এখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে পালিত এসব কর্মসূচির ব্যাপারে পত্র-পত্রিকা কিংবা টিভি চ্যানেলগুলোতেও সংবাদ প্রচারিত হয়। কখনো পরিচ্ছন্ন রাঙামাটি, কখনো ক্লিন রাঙামাটি আবার কখনো গ্রীন রাঙামাটি নামে পরিচালিত এসব মহৎ কর্মসূচিগুলোতে মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তাসহ সমাজের এলিট শ্রেণীর প্রতিটি লোকজন অংশ নেন। তাদের দেখাদেখি সমাজের সাধারণ অথচ সচেতন লোকজনও এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। অনেকে নেমে পড়েন ঝাড়– হাতে আবার অনেকে ডাস্টবিনের বালতি হাতে। একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়েই চলে এসব কর্মসূচি। জনগণকে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য আয়োজন করা হয় সমাবেশের কিংবা সচেনতামূলক র‌্যালির। আয়োজনে রাখা হয় না কোন প্রকার ঘাটতি। সবাই আয়োজনের বিশালতা এবং ব্যাপক উপস্থিতি দেখে আশায় বুক বাঁধে এরা মনে করেন যে অন্তত এবার কিছুটা হবে। কিন্ত বিধিবাম। অনুষ্ঠানের দু’একদিন পর আবারো সেই পুরানো চেহারা। একই চিত্র কাপ্তাই হ্রদের ক্ষেত্রেও। এতকিছু প্রচার প্রচারণা কিংবা জনসচেতনতা সৃষ্টিমূলক কাজ করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং বলা যায় প্রিয় শহর রাঙামাটির পরিচ্ছন্নতা কিংবা সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হচ্ছে আর কাপ্তাই হ্রদ পরিণত হতে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গায়।

একটি কথা না বললেই নয় সেটি হচ্ছে রাঙামাটিকে নিয়ে যারা এক সময় স্বপ্ন দেখতেন সেসব স্বপ্নবাজদের এখন আর ভূমিকা নেই। তাদের পরিকল্পিত এবং পরিচ্ছন্ন রাঙামাটি শহরের স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ায় তারা এখন আর লাইম লাইটে নেই। রাঙামাটি শহরকে নিয়ে এখন অনেকে বাণিজ্যিক ভাবনায় মগ্ন। তাদের কাছে রাঙামাটি শহরের প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষার বিষয়টি গৌণ। রাঙামাটিকে নিয়ে বাণিজ্যিক চিন্তাভাবনার লোকজনের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। অপরদিকে রাঙামাটি শহরকে একটি পরিকল্পিত শহর হিসাবে গড়ে তোলার কোনও স্পষ্টত পরিকল্পনা আজ অবদি গৃহিত না হওয়ায় পরিকল্পনাবিহীনভাবে গড়ে উঠছে এই শহর।
যাদের বাণিজ্যিকায়নের দৃষ্টিতে পৃষ্ট হচ্ছে আজ প্রিয় রাঙামাটি একদিন হয়তো তাদের ই উত্তরসূরীরা একদিন পরিচ্ছন্ন নির্মল হাওয়া পাওয়ার জন্য কিংবা কাপ্তাই হ্রদের একফোটা বিশুদ্ধ জল পাওয়ার জন্য খুঁজে বেড়াবে আগের রাঙামাটিকে তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও সেই আহ্লাদ পূরণ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করা যায় কিন্তু ধ্বংস করা প্রকৃতিকে হাজারো চেষ্টা করেও ফিরিয়ে আনা যায় না।

লেখক: সিনিয়র সংবাদকর্মী ও অধ্যক্ষ, রাঙামাটি শিশু নিকেতন।

আরো দেখুন

উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদের সমঝোতা স্মারক সই

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় টেকসই সামাজিক সেবা প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

three × 4 =