গত বছর খরচ ১৪ কোটি,এবার আসছে ২০০ কোটি

‘প্রশ্নবিদ্ধ রাঙামাটির সড়ক সংস্কার’


প্রকাশের সময়: জুন 15, 2018

‘প্রশ্নবিদ্ধ রাঙামাটির সড়ক সংস্কার’

‘সড়ক বিভাগের কর্তারাতো নিজেদের পকেটভারি করার চিন্তা করেছেন,আমাদের স্বার্থ চিন্তা করেননি। তারা যে ব্রীজটা করেছে সেটা তো আমাদের কোন কাজেই আসেনি,আমরা তো পাহাড়ের পাশের আগের সড়ক দিয়েই গাড়ী চালাচ্ছি,তবে এতো টাকা ব্যয়ে ব্রীজটি কেনো করা হলো ? এই ব্রীজ দিয়ে তো আমরা গাড়ি চালাতে পারি না। আর তারা বিভিন্নস্থানে বল্লি গেড়ে যে সড়ক সংস্কারকাজ করলো,এটাতো এখন আর কোথাও হয়না। তারা প্রতিরক্ষা দেয়াল না করে বেহুদাই অর্থ অপচয় করেছে,নিজেদের পকেট ভারি করেছে’। এভাবেই ২০১৭ সালের দুর্যোগের পর রাঙামাটির সড়ক সংস্কার কাজ নিয়ে নিজের ক্ষোভ,হতাশা আর অভিযোগের কথা জানিয়েছেন রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দিন সেলিম।

২০১৭ সালের ১২ জুন থেকে ভারি বর্ষনের পর রাতেই বিভিন্নস্থানে পাহাড় ধসে রাঙামাটি শহর ও উপজেলায় ১২০ জন নিহত হন, আহত হয় ১৯২ জন। এসময় জেলার ৭টি সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ৭টি সড়কের ১৪৫টি স্থানে পাহাড় ধস , ৩টি স্থানে রাস্তা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ১১৩ টি স্থানে সড়কের পাশের অংশ ভেঙ্গে পড়ে । এসব সড়ক যান চলাচনের জন্য অনুপযোগি হয়ে পড়েছিল। এসব সড়ক সংস্কার করতে তাৎক্ষনিক বরাদ্দ মেলে ১৪ কোটি টাকার। যা গত এক বছর ধরে কাজ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংস্কার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই কাজের মান নিয়ে তৈরি হয় প্রশ্ন। তারহুড়ো করে কোন প্রকার দরপত্র আহ্বান ছাড়াই জরুরীভিত্তিতে করা এই কাজের বেশিরভাগই করেছেন জেলার প্রভাবশালী ঠিকাদারই। শহরের বিভিন্নস্থানে ছোট ছোট গাছের ঢালপালা কেটে বল্লি মারা আর মাটির বস্তা ফেলেই শেষ হয়েছে এসব কাজ। কাজগুলোর শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছে রাঙামাটিবাসি।

রাঙামাটি-বান্দরবান, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের অস্থায়ী প্রতিরক্ষার জন্য ১০ থেতে ১১ জন ঠিকাদার কাজ করেন,যাদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাসীন দলের সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পৃক্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, এই কাজের স্থায়ীত্বকাল ৬ মাসের। সড়ক বিভাগ পরিকল্পনা করতে করতে দিন পার করেছে, এজন্য সড়কের এই অবস্থা। তিনি দাবি করেন,ঠিকাদারদের চেয়ে সড়ক বিভাগের দায়’ই বেশি।

পাহাড় ধসে সবচে বড় ধস হয় শালবল এলাকায়। সেখানে বিশাল ধসের কারণে সারাদেশের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাঙামাটি। সেই ধসে যাওয়া রাস্তা সংযোগ কাজের সেতু নির্মাণ কাজের ঠিকাদার নিজাম উদ্দিন মিশু বলেন, ‘বেইলি ব্রিজের পিলারের কাজ এবং নিচে প্রতিরক্ষা ওয়াল নির্মাণের কাজ করেছি আমি। সেতুটি তো করা হয়েছিলো ছয়মাসের জন্য। ছয়মাসে তো কিছু হয়নি। ছয়মাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কেউ কিছু বললে তো আমার কিছুই করার নেই।’

রাঙামাটি শহরের বিভিন্নস্থানে সড়কের পাশে বল্লি মেরে অস্থায়ী রক্ষার কাজ করেছিল নিউ রোজ,রাঙামাটি ট্রেডার্স,লিটন এন্টারপ্রাইজ,মাওরুম এন্টারপ্রাইজ,মেসার্স বিআলম,ব্যাজিও এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স হলেও কাজ করেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ঠিকাদাররাই।

এসব ঠিকাদারদেরই একজন লিটন মাঝি । তিনি বলেন, ‘৪টি প্যাকেজে মোট ২ কোটি টাকার কাজ ছিল। এর মধ্যে আমরা ১ কোটি টাকা করেছিলাম। এখন সেই কাজের যদি কোনটি ভেঙ্গে যায়,তবে সেগুলো বর্ষা শেষ হলে ঠিক করে দিব।’

তবে ঠিকাদাররা যাই বলুক না কেনো,২০১৭ সালের পাহাড়ধসের পর জোড়াতালি দিয়েই চালু রাখা হয়েছে রাঙামাটির যোগাযোগ ব্যবস্থা। রাঙমাটি-চট্টগ্রাম সড়কের দূরত্ব ৭৪ কিলোমিটার। এই সড়কের ৬০টি স্থানে পাহাড়ধস হয়ে সড়কের ওপর মাটি পড়ে। ২০টির বেশি জায়গায় বড় বড় ফাটল ধরে। দুটি স্থানে সড়কের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিল। ধসের পর বড় বড় ফাটলের অংশে খুঁটি দিয়ে সড়ক ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় ৮দিন পর হালকা যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও তা প্রায় ২ মাস পার ভারী যান চলাচল শুরু হয়। গত কয়েকদিনে টানা বর্ষণে বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার করা রাস্তাটি আবারো ভাঙ্গনের কাবলে পড়ে। সড়ক বিভাগের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিক সমাজের মানুষেরা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিকশনের সদস্য ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)’র রাঙামাটির সহ-সভাপতি বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, ‘রাঙামাটি সড়ক বিভাগের সুনাম ভালো না। ১৪ কোটি টাকা খরচ করে রাস্তার কাজ করার পরও টানা দু দিনের বর্ষণে অনেক জায়গায় ভেঙ্গে গেলো, এর দায় কে নিবে? আসলে সড়ক বিভাগের কাজ নিয়ে রাঙামাটির সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট নয়।’

রাঙামাটির প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি প্রবীন সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে জানান, ‘আমার মনে হয় না ১৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। গত এক বছরে রাস্তা ঘাটের তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। এটা খুবই দুঃখ জনক। পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ এটাই মূল সড়ক। আর এই সড়কের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে ভবিষ্যৎ কঠিন পরিস্থিতি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটির স্থায়ীভাবে ঠিক করা হউক।

পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত নেতারা বলছেন, গত বছর পাহাড় ধসের পর যে কাজ হয়েছে তা সাময়িক কিন্তু স্থায়ীভাবে কাজ না করলে এই বর্ষায় আবরো যদি পাহাড় ধস হয় তাহলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা কঠিন হবে। পাহাড় ধসের ১ বছরেও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট এবং স্থাপনা পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। আমরা দেখি এখানে কাজের সমন্বয়ের অভাব হয়েছে।

রাঙামাটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত একবছর ধরে সড়ক সংস্কারে প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ হওয়ার পাশাপাশি যেসব স্থানের জন্য এসব টাকা খরচ করা হয়েছে অস্থায়ীভাবে তাকে স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে ইতোমধ্যেই মন্ত্রনালয়ে ১৭০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে,যা ছিলো ২০১৫ সালের শিডিউল রেট অনুসারে। নতুন রেট শিডিউলে সেটার পরিমাণ হবে ন্যুনতম ২০০ কোটি টাকা। এই টাকা ব্যয়ে সড়ক সড়ক বিভাগের বিশেষজ্ঞগ টিম এসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন শেষে একটি নকশা দিয়েছেন এ বছরের জানুয়ারি মাসে। এপ্রিলে তা মন্ত্রণালয়ে তা পাঠানো হয়। তা যাচাই বাছাই শেষে মে মাসের শেষ দিকে আভ্যন্তরিণ যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুলাই এর মাঝামাঝি সময়ে এটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা রয়েছে।

রাঙমাটি সড়ক বিভাগের দায়িত্বরত নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন জানান, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হলে স্থায়ীভাবে রাস্তাগুলো টেকসই করার জন্য আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আমরা কাজ শুরু করতে পারবো। তখন আমাদের সব সড়কগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা যাবে। প্রকল্পে আমরা সড়ক বিভাবের ক্ষতিগ্রস্ত ৬টি রাস্তার মোট ১২৮টি স্থানে ৪ হাজার ৭২৫ মিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল করার পরিকল্পনা আছে। ১৪ কোটি টাকার কাজে কোন অনিয়মত হয়নি বলে দাবি করে তিনি বলেন,তখন যে কাজ কাজ হয়েছে সবই হয়েছে জরুরীভিত্তিতে,সড়ক মেরামত করে চলাচল উপযোগি করার স্বার্থেই।

রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম বলেন, ‘দীর্ঘ এক বছর পর রাস্তার যা কাজ হয়েছে তার সবই অস্থায়ী, স্থায়ী কোন কাজ হয়নি। গত বছরের মত যদি এবারও বৃষ্টি হয় তাহলে এই রাস্তা টিকবে না। এখানে কাজের সমন্বয়ের অভাব আছে। সড়ক বিভাগ সব সময় নিজের মত কাজ করে। আমরা মনে করি জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য বিভাগের সাথে সমন্বয়ে কাজ করলে কাজটি আরো সহজভাবে করা যেত। সড়ক বিভাগ অস্থায়ী কাজের নামে যে ১৪ কোটি টাকা খরচ করলো তা দিয়ে স্থায়ী কাজই করা যেতো। এটা ছিলো শুধুই অপচয়।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Md Iqbal
Guest

আর্মি কে দিয়ে কাজ করালে এমন টা হতোনা

Ripon Tripura Babu
Guest

সব শালারা চোর…..

Tiplu Datta
Guest

এসব বলে লাভ নেই। ক্ষমতা যার আছে, তারাই এভাবে দেশটাকে গিলে খায়।

TU H IN
Guest

১৪ কোটি টাকার কাজ করলে চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি সড়ক এয়ারপোর্ট হয়ে যেত।

দুদক গেলি কই।

Masha Marma Marma
Guest

এত টাকার গেল কৈ?তারপরও রাস্তা এই অবস্থা।

Belal Uddin
Guest

১৪কোটি টাকা যদি আমি পেতাম।তাহলে জাহাস রাস্তা জাহাস চলাচল করতো