নীড় পাতা / ফিচার / খোলা জানালা / পাহাড়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন এবং কিছু কথা

পাহাড়ের উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গন এবং কিছু কথা

আবারো উত্তপ্ত পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজনৈতিক অঙ্গন। আবারো রক্তাক্ত এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গন। সকলের মাঝে এক অজানা আতংক কি হতে যাচ্ছে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি? জাতীয় রাজনীতিক দলের সাথে স্থানীয় কিংবা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব সংঘাত কিংবা স্থানীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোথায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে একথা বলতে দ্বিধা নেই এটি এখানকার রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য মোটেই শুভকর নয়। এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত।

গত ৫ ডিসেম্বর একই দিন দুটি রাজনৈতিক হত্যা এবং একটি রাজনৈতিক হামলার ঘটনায় হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠে রাঙামাটির রাজনৈতিক পরিবেশ। তবে একথা সত্যি যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছর পূর্তিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখানকার সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে একাধিক স্থানীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের কড়া বক্তব্য এবং বিভিন্ন হুমকিতে সকলের মধ্যে একটি আশঙ্কার সৃষ্টি করেছিল। অপর দিকে স্থানীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ইউপিডিএফ এর মধ্যকার প্রকাশ্য বিভক্তি (ইউপিডিএফ এবং গণতন্ত্রী ইউপিডিএফ) অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের আগাম সংকেত দিয়েছিল।

৫ ডিসেম্বরের প্রথম ঘটনার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা দেখা যাবে বিভক্তি ইউপিডিএফের একপক্ষের নেতা প্রাক্তন ইউপি মেম্বার অনাদি রঞ্জন চাকমাকে নানিয়ারচরে যখন হত্যা করা হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয় এটি তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দল। যেহেতু নানিয়ারচরে ইউপিডিএফের আধিপত্য রয়েছে সেহেতু এখানে ইউপিডিএফ এর মধ্যকার বিভক্তি হবে এটাই স্বাভাবিক। আর রাঙামাটির আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে হানাহানি এবং রক্তারক্তি এখানকার জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। বিভিন্ন সময় জেএসএস এবং ইউপিডিএফ এর মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত এবং অনেক সময় দলের মধ্যে আন্তঃসংঘাত এর ঘটনা ঘটলেও এইসব ঘটনা খুব বেশি দূর এগোতে পারে না। সে হিসাবে ৫ ডিসেম্বরের নানিয়ারচরে অনাদি রঞ্জন চাকমার হত্যাকান্ডটি পত্রিকা এবং বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলের জন্য ব্রেকিং নিউজ হলেও এখানকার সামগ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি।

তবে একই দিন রাঙামাটি বিলইছড়ি উপজেলার উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মারমার ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনার যে আবহ সৃষ্টি করে একই দিন সন্ধ্যায় জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমার ওপর হামলা তাঁকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে বিলাইছড়ি এবং জুরাছড়িতে দলীয় নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় সরাসরি দায়ী করা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে। আর এই ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কোন্দল পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সংসদীয় আসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় এবং জেএসএস সমর্থিত প্রার্থীর বিজয়কে কেন্দ্র করে এখানে জেএসএস এর সাথে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় তা পরবর্তীতে দিনকে দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। নির্বাচনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় জেএসএস সমর্থিত প্রার্থী জোর করে করে বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র দখল এবং অস্ত্রের মুখে তাদের জয় নিশ্চিত করেছে। সে থেকে এখানে জেএসএস এবং আওয়ামী লীগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সংঘাত অব্যাহত থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র রাজনীতিসহ এখানে জেএসএসের অবৈধ অস্ত্রের মুখে রাঙামাটিবাসীকে জিম্মি করে রাখাসহ এখানকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডে ব্যাপক চাঁদাবাজির ঘটনায় বরাবর সোচ্চার থাকে আওয়ামী লীগ।

অপর দিকে এখানকার স্থানীয় উনিয়ন পরিষদ নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বেশিরভাগ আসনে জেএসএস সমর্থিত প্রার্থীর বিজয়ের বিষয়েও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এর প্রার্থীদের জোর করে হারানো হয়েছে। সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। অস্ত্রের মুখে ভোটারদের ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে অনেক ইউপি কিংবা উপজেলা পরিষদে আওয়ামীলীগ প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তাদেরকে জোর করে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেএসএস সমর্থিত বিভিন্ন উপজেলাগুলোতে উপজাতীয় লোকজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যাতে সম্পৃক্ত সে ব্যাপারেও তাদের হুমকি দেয়া হয় বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। এনিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর মধ্যে এমনিতেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

৫ ডিসেম্বর একই দিন উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামীলীগ এর এক নেতাকে হত্যা এবং অপর এক নেতাকে গুরুতর আহত করার ঘটনা রাঙামাটির আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের কিভাবে সংক্ষুদ্ধ করে তার প্রমাণ মেলে ৬ ডিসেম্বর রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদ সমাবেশ এবং ৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ আহুত রাঙামাটিতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহবান এবং কঠোরভাবে হরতাল পালনের ঘটনা। ক্ষমতাসীন দল হওয়ার পরেও কতটুকু সংক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ এই হরতালের আহবান করে এবং কঠোরভাবে হরতাল পালন করে সহজেই অনুমেয়। চলমান ধারার বিপরীতে ক্ষতাসীন দলের আহবানে রাঙামাটিতে আহুত এই হরতাল অনেকেকে বিস্মিত করলেও অনেকের মতে এই কর্মসূচি ছাড়া উপায় ছিল না ক্ষমতাসীন দলের। দলের সংক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিন্নতা আনতে হয় বলে তাদের অভিমত।

যাই হোক ৫ ডিসেম্বর জুরাছড়িতে আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা বিলাইছড়িতে আওয়ামীলীগ নেতাকে আহত করার ঘটনার পর ৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে খোদ রাঙামাটি শহরে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগ সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাকে তারঁই বাসভবনে হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনা এখানকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যকার পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বৃদ্ধি করে।

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে ইতিপূর্বেও একাধিক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটলেও সেই সব হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু বিচার খুব একটা দেখা যায়নি। বিশেষ করে এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার আভ্যন্তরীণ সংঘাতকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকান্ডের ঘটনাগুলোর বিচার কার্যক্রম খুব একটা আলোর মুখ দেখেনি। বিশেষ করে এইসব হত্যাকান্ডের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে থানায় মামলাও দায়ের করেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ বাদী হয়ে এইসব হত্যাকান্ডের মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে নানান আইনি জটিলতা, সাক্ষীর অভাবসহ বিভিন্ন বিষয় মিলিয়ে এই সব হত্যাকান্ডের মামলাগুলো বেশিদূর এগোতে পারে না।

যাই হোক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এক নেতাকে হত্যা এবং দুইজনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় এবার রাঙামাটির পুলিশ প্রশাসন যে শক্ত অভিযানে নেমেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ইতিমধ্যে ৭ ডিসেম্বর রাতে রাঙামাটি শহর এবং বিলাইছড়িতে পুলিশী অভিযান চালিয়ে এইসব ঘটনার এজাহারভূক্ত আসামি বিলাইছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা অব্যাহত থাকায় এবার ভিন্ন কিছু ঘটতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির রাজনৈতিক অঙ্গন বরাবরই উত্তপ্ত। এই ক্ষেত্রে অপর দুই পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলার রাজনৈতিক পরিবশের চাইতে এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনের এই ভিন্নতা প্রায়শ ক্ষেত্রে আমাদের জন্য শংকার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাতের জেরে এখানকার সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যাহত হচ্ছে পাশাপাশি এখানকার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবশে এখানকার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। পারস্পারিক বিশ্বাস এবং সম্প্রীতির বন্ধনকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এখানকার অনেক পরিবার তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তা মুখে পড়ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাদের ভবিষ্যৎ। এসব কিছুরই অবসান হওয়া উচিত।

লেখক: সিনিয়র সংবাদকর্মী ও অধ্যক্ষ, রাঙামাটি শিশু নিকেতন।

আরো দেখুন

পানছড়িতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১, আহত ৩

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলা সদর বাজারে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১জন নিহত এবং ৩জন আহত হয়েছে। সোমবার …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

twelve − 3 =