পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির দুই দশক : সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে নানান বাধা


কাজী হাফিজ প্রকাশের সময়: ডিসেম্বর 1, 2017

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির দুই দশক : সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে নানান বাধা

তিন বছর আগে ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈ সিং জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা এরই মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। এ ছাড়া ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিন বছর পর ওই তথ্য প্রায় অপরিবর্তিত। বর্তমান তথ্য, বাস্তবায়িত ৪৮টি ধারার বাইরে ১৬টি ধারা আংশিক বা বেশির ভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আটটি ধারা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

অন্যদিকে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার দাবি, চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তিনি এ বিষয়ে সরকারের অনিচ্ছাকেই দায়ী করেন। গত ২৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ওই দাবি করেন।

তবে চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সরকারের একার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সন্তু লারমার দাবির সঙ্গে একমত নন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার। গতকাল শুক্রবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যাঁরা বলছেন সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী না, তাঁরা ঠিক বলছেন না। সব কিছুতে না না বলে, সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে কোনো সুফল আসবে না।
চুক্তি বাস্তবায়নে উভয় পক্ষেরই ইতিবাচক মনোভাব থাকতে হবে। এ চুক্তি কোনো জড় পদার্থের বিষয়ে হয়নি। এর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আছে। দেশের সব রাজনৈতিক দল এ চুক্তির বিষয়ে একমত ছিল না। সাবেক গেরিলা ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ড দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকেও নিজেদের সঙ্গে নেপাল সরকারের চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করাতে পারেননি। এর অর্থ কি এই যে তিনি চুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহী ছিলেন না? ১৯৯৮ সালে নর্দান আয়ারল্যান্ডের বিষয়ে গুডফ্রাইডে চুক্তি সরকারি দল ও বিরোধী দল সবার সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। চুক্তির ২ শতাংশ বিষয় সুযোগ না থাকার কারণে পরিত্যাগ করা হয়েছে। ’

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাজধানীতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদের তখনকার চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে সই করেছিলেন। শান্তিচুক্তি নামে পরিচিত ওই চুক্তির মধ্য দিয়ে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের একাংশ অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিবদমান দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের যবনিকাপাতের সূচনা হয় এবং অবারিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের দ্বার। সেই প্রক্রিয়া এখনো চলমান। সেই চুক্তির ২০তম বর্ষ পূর্ণ হলো আজ ২ ডিসেম্বর।

১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অস্ত্র সমর্পণ করে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে জেএসএসেরই আরেকটি অংশ ওই চুক্তিকে প্রতারণামূলক ও প্রহসন আখ্যা দিয়ে কালো পতাকা দেখিয়ে অস্ত্র সমর্পণে বিরত থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবিতে সে বছরের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। ইউপিডিএফের নামে পরিচালিত ফেসবুক আইডিতে এখন স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের দাবিও করা হচ্ছে। এসব দলের প্রবাসী গ্রুপগুলোও এখন স্বাধীন জুম্মল্যান্ড দাবির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। চুক্তির সময় উপজাতি পরিচয়ে আপত্তি না থাকলেও ইদানীং নিজেদের আদিবাসী পরিচয়ে পরিচিত করানোর তৎপরতা চলছে। ধারণা করা হয়, এই দাবি এবং সন্তু লারমা ও প্রসীতের নেতৃত্বে দুই সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে অন্যতম অন্তরায়। এ দুই দলেরই সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ দুই গ্রুপ আরো খণ্ডিত হয়ে চার গ্রুপে বিভক্ত। খণ্ডিত দলগুলোরও সশস্ত্র শাখা রয়েছে।

ইউপিডিএফের ব্যাপক দুর্নীতি ও অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ১৪ নভেম্বর ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে একটি আঞ্চলিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতির মধ্যে আত্মকলহের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ২০০৮ সালে গড়ে ওঠে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। এসব দলের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সদস্যরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। নিজস্ব ইউনিফর্মও রয়েছে এদের। চাঁদাবাজিই এদের আয়ের প্রধান উৎস বলে অভিযোগ আছে।

চাঁদাবাজির এ অভিযোগ সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে ২৯ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা বলেন, ‘জোর করে নিলে সেটাকে চাঁদাবাজি বলে। জোর করে নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটাই প্রশ্ন। এটি একটি সাহিত্যের বিষয়। অত ব্যাখ্যায় আমি যাব না। জেএসএস চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। আর দুর্নীতি, চাঁদাবাজি তো সারা বাংলাদেশেই হচ্ছে। যারা চুক্তি বাস্তবায়ন হতে দিতে চায় না তারাই এসব অভিযোগ করে। ’

সব অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রধান শর্ত পূরণ করেছেন কি না এবং করে থাকলে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর তৎপরতা এখনো বহাল আছে কেন জানতে চাইলে এসব প্রশ্নে সন্তু লারমা বলেন, ‘আমাদের কাছে ভাঙাচোরা যত অস্ত্র ছিল সবই জমা দেওয়া হয়েছে। এত দিন পর এসব প্রশ্ন এখন উঠছে কেন?’ ইউপিডিএফ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইউপিডিএফের জন্মের ইতিহাস তো সবারই জানা।

সন্তু লারমার এ মন্তব্যের বিষয়ে দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, “শান্তিচুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার জন্য অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজিও দায়ী। সন্তু লারমা বলছেন, ‘আমরা চাঁদাবাজি করি না’, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা বিশ্বাস করে না। অবৈধ অস্ত্রধারী, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাও চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে আছে। ”

২০ বছরে অর্জন : পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হালনাগদ তথ্য অনুসারে এই ২০ বছরে চুক্তি অনুযায়ী অর্জনগুলো হচ্ছে—পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টি; তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদ শক্তিশালী করা; পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, সমবায়, মৎস্য, সমাজকল্যাণসহ ৩০টি বিভাগ বা বিষয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর; নতুন রাস্তা ও সেতু নির্মাণের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন; সার্কেল চিফ বা হেডম্যান বা কারবারিদের ভাতা বৃদ্ধি; ঢাকার বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণ; তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিবছর শিক্ষাবৃত্তি প্রদান; কৃষকদের উন্নয়নে মিশ্র ফলের বাগান সৃজন; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন; ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স গঠন; রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজ এবং রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণ, বিদুৎ সঞ্চালন লাইন সম্প্রসারণ ও সাবস্টেশন স্থাপন; চার হাজার পাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান; চারটি আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ; মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক চালু এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ সুবিধা বৃদ্ধি।

তবে এসব উন্নয়নকাজে সন্তুষ্ট নন সন্তু লারমা। গত ২৯ নভেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ সব উন্নয়নকাজের সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের। কিন্তু আঞ্চলিক পরিষদকে পাশ কাটিয়ে সরকার উন্নয়নকাজ পরিচালনা করছে, যা চুক্তির সরাসরি বরখেলাপ বলে বিবেচনা করা যায়। এখনো আগের মতো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমানে পার্বত্য তিন জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেরই সংসদ সদস্য ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর সদস্য। অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ এবং তিন পার্বত্য জেলার ১১০টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মধ্যে ৭৫টির চেয়ারম্যান ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর।

গত বছর অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে স্থানীয় পাহাড়ি রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র তৎপরতা ও হুমকির কারণে রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলার ৪৯টি ইউপির ভোট স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। জানা যায়, ওই হুমকির কারণে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ১৯টি ইউপিতে এবং বিএনপি ২৭টিতে কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি।

কিন্তু সন্তু লারমার অভিযোগ, পার্বত্য তিন জেলা পরিষদকে সরকারি দলের শাখা অফিস ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো সেনা শাসন চলছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সেনা শাসনের মধ্যেও নির্বাচন হতে পারে। আর নির্বাচন হলেই কি গণতন্ত্র আসে? বাংলাদেশে কি গণতন্ত্র আছে? পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারে যারা আছে তাদের বেশির ভাগই উপজাতি হলেও তারা আওয়ামী লীগ করে। ’

সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার : চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলার সদরে তিনটি এবং আলীকদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা যাবে। ’

বর্তমানে ‘অপারেশন উত্তরণ’-এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা দিচ্ছে সেনাবাহিনী।

সাম্প্রতিক সময়ের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চুক্তির পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯ বছর ১০ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে দুই হাজার ১৯৯ জন নিহত হয়। আহত হয় দুই হাজার ২৯০ জন এবং অপহৃত হয় দুই হাজার ৩৯২ জন। এই সহিংসতার বেশির ভাগ শিকার বাঙালিরা এবং এক-তৃতীয়াংশ ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর সদস্যরা। অস্ত্র উদ্ধারের পরিমাণও চুক্তির আগের তুলনায় বেড়েছে। চুক্তির আগে নিরাপত্তা বাহিনী ১৬ শতাধিক অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করেছিল। এসবের মধ্যে গ্রেনেড ৩৫৯টি, মর্টার ৭০টি, মাইন ১৩টি এবং অন্যান্য গোলাবারুদ সাড়ে চার লাখ। আর শান্তিচুক্তির পরে ২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার ৭৩০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি আগের তুলনায় কমলেও বন্ধ হয়নি। চুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছিলেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩, বিজিবির ৯৬, পুলিশের ৬৪, আনসার-ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে কর্মকর্তা পাঁচজন, জেসিও তিনজন এবং বাকিরা সৈনিক। চুক্তির আগে শুধু ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬০ জন সদস্যের। আর চুক্তির পরে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য মারা গেছেন। এর মধ্যে পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১১ জন, পাঁচজন নিহত হয়েছেন রাঙামাটির ভূমিধসে। আর ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন ৮১ জন।

এসব তথ্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রমাণ বহন করে না। এ ছাড়া প্রত্যাশা অনুসারে পার্বত্য এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাওয়ার বিপরীতে বিভেদ বেড়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা। গত বছরের ২ জুন স্থানীয় যুবলীগ নেতা ও ভাড়ার মোটরসাইকেলচালক নুরুল ইসলাম নয়নকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাঙামাটির লংগদুতে ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর প্রায় ৩০০ বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এর আগেও ১০ বছরে বাঙালি মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে ১২ জনকে হত্যা, পাঁচজনকে গুম করা হয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেও পার্বত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনীর একটি ব্রিগেডসহ গভীর জঙ্গলে থাকা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে সড়কের পাশের ক্যাম্পগুলো। খাগড়াছড়িতে মোট ৬৫টি সেনা ক্যাম্প ছিল। এখন আছে ৩৫টি। গুইমারায় ৪০টির মধ্যে আছে ১৮টি। রাঙামাটির ৫৮টি ক্যাম্পের মধ্যে আছে ৩২টি। আর বান্দরবানের ৬৯টি ক্যাম্পের মধ্যে আছে ২৮টি। অর্থাৎ চুক্তির পর মোট ১১৯টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্যান্য বাহিনীর আরো ১১৯টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে।

(দৈনিক কালের কন্ঠে ২ ডিসেম্বর-২০১৭ তারিখে প্রকাশিত রিপোর্ট, আমাদের পাঠকদের জন্য অন্য আলো বিভাগে প্রকাশ করা হলো)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz