পান সমাচার…….


তানিয়া এ্যানি প্রকাশের সময়: নভেম্বর 5, 2017

পান সমাচার…….

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে লেখা শ্রীমদ্ভগবত মতে পান খাওয়ার অভ্যেস ছিলো দেবতা শ্রী কৃষ্ণেরও।দেব চিকিৎসক ধন্বন্তরার সহায়তায় আয়ুর্বেদ পন্ডিতরা এটা আবিষ্কার করেন।
ইতিহাস বলে,সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানেরও পান খাওয়ার অভ্যেস ছিল।এবং তিনি অন্দরমহলের অন্যদের মাঝেও এই অভ্যেস জনপ্রিয় করে তোলেন।মধ্যযুগের কবি আলাওলের কবিতা,ইবনে বতুতার ভাষ্যতেও তৎকালীন পানের প্রচলন
উল্লেখযোগ্য।ইউসুফ জুলেখা কাব্যেও উল্লেখ পাওয়া যায় রূপোর পানের বাটার কথা।মনসামঙ্গল কাব্যে উল্ল্যেখ আছে,চাঁদ সওদাগরের স্ত্রী সনকা পানের সঙ্গে এমন উপাদান মিশ্রন করতেন যাতে ঠোঁট লাল টকটকে হয়ে যেত।আর তাতে বিমোহিত হতেন চাঁদ সওদাগর।
ইতিহাস এবং ঐতিহ্যগতভাবেই এই অঞ্চলে পান বিশেষ স্থান দখল করে আছে।সামাজিক রীতি নীতি উৎসব,পূজা পার্বনে একসময় পান ছিলো অবিচ্ছেদ্য অংশ।প্রাচীন রাজ পরিবারে পান ছিলো আভিজাত্যের প্রতীক সেই সাথে লোকজ শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেত রাজসভায়।পান পরিবেশনের জন্য রাজার ছিলো ‘তাম্বুলকরঙ্ক’ নামে বিশেষ দাসশ্রেনী।
কেবল দক্ষিন এশিয়াই নয়,উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহ,দক্ষিন পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষজনও পান খায়।
সংস্কৃত ‘পর্ন’শব্দ থেকে বাংলায় পান শব্দটির এসছে।শাস্ত্র মতে,সুপারি খয়ের যুক্ত হয়ে পান তামাটে বর্ণ ধারন করে বলে তাকে ‘তাম্বুল’ও বলা হয়।সংস্কৃত ‘তাম্র’ থেকে ‘তাম্বুল’।পানের ডিব্বার নাম ছিলো ‘তাম্বুলসম্পুট’।
দেশভেদে পান পাতার নামও ভিন্ন।বাংলায় পান পাতাকে বলা হয় ‘পান’,হিন্দীতে ‘পায়ান’,সংস্কৃতিতে ‘নাগাভাল্মী'(গাছের সাথে পেঁচিয়ে থাকে বলে),ফারসী ভাষায় বলা হয় ‘তানবুল’নামে।
ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারক বাহক হিসেবে এই অঞ্চলে পান এখনো স্বমহিমায় বিদ্যমান।তবে রাজা গেছে পানের আভিজাত্যও গেছে।এখন মূলত সর্বসাধারনের অবসরের অভ্যেস হিসেবেই পান বিশেষ উল্লেখযোগ্য।তবে বাংলার গ্রাম বাংলায় এখনো পানের আভিজাত্য ফুরায়নি।বিয়ে সংক্রান্ত কার্যাদী,শ্বশুরবাড়িতে পানের বিরা হাতে নতুন জামাইয়ের উপস্থিতি অন্তত সেটাই জানান দেয়।শহুরে বিয়েবাড়িতে ইদানীং বেশ আভিজাত্য নিয়েই আয়োজন থাকে পানের।
বাংলাদেশে উৎপাদিত বাংলা, মিঠা,সাচী,কর্পুরী,চেরফুলী,সন্তোষী, জাইলো,ভাওলা,ঝাল প্রভৃতির মধ্যে মহেশখালীর মিষ্টি পান বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীর অধিবাসীদের সুপ্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী পেশা পান চাষ।সমগ্র বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ মিষ্টি পান চাষ হয় মহেশখালী দ্বীপে।যার রপ্তানি ক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে ইউরোপ আমেরিকাতেও।
শহর রাঙামাটির অন্যতম প্রানকেন্দ্র তবলছড়িতে চলছে রাসপূজা উপলক্ষ্যে রাসমেলা।মহেশখালির মিষ্টি পানের সাথে ৭৪রকমের পান মশলার সম্ভার নিয়ে বসেছেন খিলি পান বিক্রেতা শাহ আলম ভাই।মেলার মূল ফটকের হাতের ডানে।পানের দাম পড়বে ২৫-২৫০।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ‘রাসলীলা’ দেখতে দেখতে আপনিও চেখে দেখতে পারেন কৃষ্ণের ‘তাম্বুল’ নেশার স্বাদ।-
অথবা শেফালী ঘোষের জনপ্রিয় গানের সুরের সাথে বাস্তবিক যোগসাযশ করতে পারেন আপনিও-
“যদি সোন্দর একখান মুখ পাইতাম
মইশখালির পানর খিলি তারে বানাইয়া খাওয়াইতাম’

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz