দীপেন-ভূট্টো : আবার দু’জন দু’জনার !


অদিতি আফ্রোদিতি, প্রকাশের সময়: আগস্ট 25, 2017

দীপেন-ভূট্টো : আবার দু’জন দু’জনার !

তিনি প্রায়ই বলেন,যুদ্ধ-প্রেম এবং রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই এবং কোন কৌশলই অপকৌশল নয়, বাস্তবেও যেনো সেই চর্চাই করে চলেছেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতা,ছাত্রদল-যুবদল হয়ে বর্তমানে জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো। গত দুই দশকে তাকে ঘিরেই একাধিকবার ‘পালাবদল’ ‘গ্রুপিং’ এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ‘মেরুকরণ’ হয়েছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে। সুক্ষ রাজনৈতিক বুদ্ধি আর কৌশলের প্রশংসা করলেও দলের ভেতরেই নামে নিয়ে আছে নানান মত,ভিন্নমতও। কেউ কেউ তাকে ‘গ্রুপিং এর রাজা’ আবার কেউবা ‘কূটকৌশল’ হিসেবেও চিহ্নিত করেন। তবে বরাবরই সোজাসাপ্টা কথা বলতে পটু ভূট্টোর সর্বশেষ রাজনৈতিক অবস্থান রাঙামাটির বিএনপি রাজনীতিতে তৈরি করেছে ভিন্ন এক মাত্রা। মাত্র একবছর আগেও যে দীপেন দেওয়ানকে প্রকাশ্যেই কটূক্তি করতেন,সেই দীপেনের সাথেই তার ‘সখ্যতা’ ও একই গ্রুপের রাজনীতি ফের আলোচনায় এনেছে তাকে। যদিও এ বিষয়ে তার ব্যাখাও তৈরি-‘ মোনাফেকের চেয়ে কাফের ভালো’ !

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠিক আগ মুহুর্তেই হঠাৎ সব আলোচনা সমালোচনাকে স্তব্দ করে দিয়ে সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মনিস্বপন দেওয়ানকে উড়িয়ে এনে বিএনপির মনোনয়ন পাইয়ে দিয়ে জয়ী করাতে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করেন ভূট্টো ও তার অনুসারিরা। তখন জেলা বিএনপির সভাপতি নাজিমউদ্দিন এবং সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক জহির আহমেদও চমকে যান ঘটনার আকস্মিকতায়। জয়ী মনিস্বপন পার্বত্য উপমন্ত্রীর দায়িত্বও পান। শুরু হয় ভূট্টোদের জয়জয়কার। কিন্তু সুখের সংসার বেশিদিন টেকেনি। ২০০৫ সালেই মনিস্বপনের সাথে বিরোধ তৈরি হয় ভূট্টোদের। জেলা পরিষদের তৎকালিন চেয়ারম্যান মানিকলাল দেওয়ানে বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিএনপির সেই আন্দোলন মনিস্বপন বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়ে দল ছাড়তেই বাধ্য হন মনিস্বপন ! মনিস্বপনহীন বিএনপিতে ২০০৬ সালে আবারো সাবেক যুগ্ম জেলা জজ দীপেন দেওয়ানকে নিয়ে মাঠে হাজির হন ভূট্টো। আবারো মূলধারার বিএনপির বিরোধীতার মুখে দীপেন দেওয়ানকে নিয়ে এগিয়ে যান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আইনগত জটিলতায় দীপেন মনোনয়ন না পেলেও তার স্ত্রী স্কুল শিক্ষক মৈত্রী চাকমাকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে ভূমিকা রাখেন ভূট্টোরা। মৈত্রী চাকমা স্বাভাবিকভাবেই পরাজিত হন। কিন্তু দীপেন দেওয়ানের সাথেও ভূট্টোর সম্পর্ক অস্বাভাবিক হতে শুরু করে,যা প্রকাশ্যে রূপ নেয় ২০১০ সালে। পরে এমনই বিরোধ শুরু হয় যে,প্রকাশ্যেই দীপেন গ্রুপ ও ভূট্টো গ্রুপ নামে পৃথক দুটি ধারা তৈরি হয় বিএনপিতে।

পৌর মেয়র নির্বাচিত হন ভূট্টো এবং নির্বাচনে তার বিরোধীতা করেছেন দীপেন দেওয়ান এমন অভিযোগে তাদের বিরোধ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। এরজন্য নাটের গুরু হিসেবে অভিহিত করা হয় ভূট্টোকেই। দীপেনকে মোকাবেলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্ণেল (অব) মনীষ দেওয়ানকে সামনে নিয়ে আসেন ভূট্টো। সর্বশেষ দলীয় কাউন্সিলে সভাপতির পদও হারান দীপেন দেওয়ান। দলীয় সভাপতি-সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন ভূট্টোর পছন্দের প্রার্থী শাহ আলম ও দীপন তালুকদার। অন্যদিকে দলীয় কার্যালয়েই অবাঞ্চিত হয়ে পড়েন দীপেন ও তার অনুসারিরা। চারদিকে ভূট্টো অনুসারিদের জয়জয়কার। কিন্তু আবারো যেনো সুখের ঘরে দু:খের আগুন। এবার খোদ নিজের গ্রুপেই বিরোধে জড়িয়ে পড়া ভূট্টো পৌর নির্বাচনে পরাজিত হন। পরাজিত হওয়ার পর নিজের পরাজয়ের পেছনে ক্ষমতাসীন ভোট লুটপাটের পাশাপাশি দলের নেতাদের ভূমিকাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেন ভূট্টো। শুরু হয় গৃহদাহ। এবং নিয়তির কি নির্মম পরিহাস,এককালে ছুঁড়ে ফেলা দীপেন দেওয়ানকে আঁকড়ে ধরেই আবার রাজনীতির নয়া মেরুকরণ শুরু করেন ভূট্টো। অর্থাৎ তার এতদিনের মিত্ররা এখন শত্রু, এবং শত্রু দীপেন দেওয়ানই মিত্র। রাঙামাটি জেলা বিএনপির মূল অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সভাপতি শাহআলম,সম্পাদক দীপন ও সাংগঠনিক সম্পাদক পনির আর অন্য অংশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক সভাপতি,কেন্দ্রীয় কমিটির সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট দীপেন দেওয়ান ও সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম ভূট্টো !

এককালের দুই প্রবল প্রতিপক্ষের আবার একঘাটে জল খাওয়ার ঘটনায় বিস্মিত দলটির নেতাকর্মীরা। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মো: শাহ আলম এ বিষয়ে বলেন,ভূট্টো কখন যে কার,সেটা সে নিজেও জানেনা। প্রয়োজনে এবং স্বার্থে,সে যে কারো সাথেই যেতে পারে এর প্রমাণ সে বারবার দিয়েছে। এখন তার আর দীপেন দেওয়ানের সম্পর্ককেও ‘প্রয়োজন ও স্বার্থ’র সম্পর্ক হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে ভূট্টোর অভিযোগকে ‘কল্পিত’ এবং ‘মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পৌরসভার কাজ ভাগাভাগিই প্রমাণ করে কে কার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে।

 

তবে সাইফুল ইসলাম ভূট্টোর দাবি, বর্তমান কমিটির শীর্ষ তিন নেতা তার সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকটা’ করেছে এবং পেছন থেকে পিঠে ছুরি মেরেছে। তাই তিনি দীপেন দেওয়ানের সাথেই আগামী দিনের রাজনীতি করবেন এবং দীপেনের নেতৃত্বেই রাঙামাটি বিএনপি আগামীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীকে নির্বাচন করবে।

দীপেনের সাথে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। মোনাফেকের চেয়ে কাফের ভালো। বর্তমান জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ‘আওয়ামীলীগের এজেন্ট’ হিসেবে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং মনীষ দেওয়ান একজন ‘আশাহীন’ মানুষ। দীপেন দেওয়ানের সাথে নিজের সম্পর্ককে ‘স্বার্থ ও প্রয়োজনের’ সম্পর্ক মানতে নারাজ তিনি বলেন, এটা কিসের সম্পর্ক সময়ই তা বলে দেবে। তবে দীপেন দেওয়ানের সাথে তার দুরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে শাহ আলম ও দীপন তালুকদারের ‘ষড়যন্ত্র’ আছে বলেও মন্তব্য তার।

অতীতে দীপেন দেওয়ানকে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করা,কটুক্তি করায় মামলা খাওয়া ভূট্টো আরো বলেন, সম্পর্কে ভুল থাকে,টানাপোড়েন থাকে আবার তা ঠিকও হয়ে যায়। দীপেন দেওয়ান যতক্ষন বিএনপির স্বার্থের পক্ষে কাজ করবেন ততদিন তার সাথে থাকবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই সম্পর্ক প্রসঙ্গে দীপেন দেওয়ান বলেন, ভূট্টো বিএনপি করেন,আমিও করি,একই দলের একই আদর্শের দুইজন মানুষের দুরত্ব কমিয়ে কাছাকাছি আসা অস্বাভাবিক কিছুনা। আমাদের মধ্যে কিছু গ্যাপ ছিলো,সেটা কেনো হয়েছিলো আমি জানিনা,তবে আমরা এখন একসাথে কাজ করছি এবং আমার বিশ্বাস আগামী নির্বাচনে আমিই দলীয় মনোনয়ন পাব।

 

 

 

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
Yusuf Harun
Guest

সুন্দর রাজনিতি মানুশের কাছে নিয়ে যাই।

Abul Salim
Guest

Political nature-tai holo..kochu pathar panir moton..

wpDiscuz