রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ

তানিয়া, মানিয়া,মিতু ও মুনদের জীবনস্বপ্নের ফুলঝুড়ি…..


তানিয়া এ্যানি প্রকাশের সময়: জানুয়ারী 13, 2018

তানিয়া, মানিয়া,মিতু ও মুনদের জীবনস্বপ্নের ফুলঝুড়ি…..

দুপুর ২টা গড়িয়ে গেছে। এক এক করে সরগরম হচ্ছে প্রতিটা কক্ষ। টেবিলের উপর মোটা চওড়া সব বই। বিছানা খানিকটা অগোছালো,বোঝাই যায় ঘুম থেকে ঊঠে কোন মতে ফ্রেশ হয়েই ক্লাশ।আজ ছুটি জলদি জলদি। ক্লান্ত শ্রান্ত মুখ গুলো ফিরে একটুখানি জিড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা তারপর আবার ছুটবে কাল যে অনুষ্টান কত কাজ বাকি। খাবারের সময়ও হয়ে গেছে। খাবার নিতে যাওয়ার পথে আবার বান্ধুবীকেও ডেকে নেয়া। বাবুর্চি জাহাঙ্গীর ভাইও নাম ধরে ডাকছে ‘তানিয়া আপা,নিশা আপা আর কি লাগবে খাবার নিয়া যান’। বেশ খুনসুটি সম্পর্ক বোঝাই যায়,জাহাঙ্গীর ভাইও হাসতে হাসতে বলে ফেললেন,”আপা মেয়েগুলা বেশি জ্বালায়”। সাথে সাথে হাসি সব কটার।

আহ্ হল জীবন। অনেক কিছুই নেই, তবুও যা আছে তার স্বাদ কজনই বা বোঝে। এই ছিলো রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রীনিবাসের দুপুরের গল্প। দোতলা এই বিল্ডিংয়ে থাকে দ্বিতীয় আর তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। আর সিনিয়ররা অন্য বিল্ডিংয়ে। প্রতি রুমে দুজন। সমস্যা জানতে চাইতেই ‘আরেহ আপু,কোথাও দেখছেন এক রুমে মাত্র দুজন থাকে! আমাদের ঢাকা মেডিকেলের বান্ধবীদের দু:খ শুনি আর হাসি আমরা, কেন হাসি জানেন? একটা সময় ওরা আমাদের খোঁচাইতো কিনা, রাঙামাটি মেডিকেলে কি আছে, কি হবে, এসব বলে !

ব্রাক্ষনবাড়িয়ার চঞ্চল তানিয়া। প্রথম প্রথম মন খারাপ হতো এত দূরে পড়তে আসবো! তাও আবার নতুন মেডিকেল কলেজ। বাসা থেকেও হ্যা না পরিস্থিতি। কিন্তু মেডিকেলে পড়ার সুযোগ হেলায় ফেলাও যায়না। সাহস করে চলে এলাম। এসে এখানকার শিক্ষকদের আন্তরিকতা সুযোগ সুবিধায় মনেহয়েছে অন্যান্য যে কোন মেডিকেলের চেয়ে অনেক ভালো আছি।

মেডিকেলের প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীকে হলেই থাকতে হয়। এখানকার যারা তাদেরও। তাই সখ্যতা গুলো আরো দৃঢ়। নিসার রুমমেট এক ব্যাচ সিনিয়র মুন। পরষ্পরের প্রতি ভালোবাসা শ্রদ্ধা দুটোই বিদ্যমান। মুনের সহজ ভাষ্য, আমাদেরতো সৌভাগ্য রাঙামাটির মত শহরে পড়াশোনাটাও হয়ে যাচ্ছে ঘুরাতো আছেই। দুপুর অব্দি ক্লাশ, সন্ধ্যা বিকেলে শহর দেখা। ডিগ্রীও পেলাম, রাঙামাটি শহর আর আশপাশটাও দেখা হলো। বড় ক্যাম্পাসের জন্য আফসোস ততটাও নেই বরং হাসতে হাসতেই উত্তর দেয়া বড় ক্যাম্পাস হলেতো দূরত্বও বেড়ে যাবে, এখনতো আমরা সবাই সবাইকে চিনি।
গল্প আড্ডায় জমে এবেলায় পেটপূজা সেরে নেয়া এই চঞ্চলাবতীদের মাঝেই। খাবারের মান যথেষ্ট ভালো। সন্তুষ্ট তারা নিজেই। দুপুরের রাতের খাবার হলেই ব্যবস্থা আর সকাল বিকেলের নাস্তা যে যার মত। ছেলেদের দুটো হলেও একই ব্যবস্থা।
২ মিনিটের দূরত্বে থাকা ক্যাম্পাসে চলছে শেষবেলার রিহার্সেল,গানের। সবার মাঝে গান গাইছে শিক্ষিকাও। এই হলো তাদের শিক্ষক ছাত্র সম্পর্ক। শিক্ষকদের বন্ধুসুলভ আচরণই আসলেই নিজ শহর থেকে দূরে বই পুস্তকের কঠিন এই জীবনটাকে সহজ করে দেয়।
চলছে ইনডোর গেইমসও। সপ্তাহব্যাপী চলা ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সমাপ্তি হবে নবীনবরণ এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। পুরো আয়োজনটা তাদের নিজেস্ব। অংশগ্রহণকারী নিজেরাই।

ক্যাম্পাসকে কাগজ কেটে ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলছে নিজেরাই। মোটা মোটা বইয়ের ভীড়েও প্রচন্ড সৃষ্টিশীল প্রাণচঞ্চল ছেলেমেয়েগুলো। একাডেমীক রেজাল্ট যেমন ভালো তেমন তাদের কাজের ধরন। পাঁচতলা ক্যম্পাসের দেয়াল জুড়ে তাদের সৃষ্টিশীলতার ছাপ। আছে নিজেদের আঁকা ছবি লিখা কবিতায় ঠাসা নিজেদের করা দেয়ালিকাও।
প্রচন্ড ব্যস্ত সবাই। ১০ জানুয়ারী তাদের প্রাণের ভালোবাসার ক্যম্পাসের যে জন্মদিনও।
১০ জানুয়ারি,রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সাজ সাজ রব ক্যাম্পাসজুড়ে। দেখতে ভাবতেই ভালো লাগছে……অথচ ৪ বছর আগের পরিস্থিতি এমন ছিলোনা। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎয়ের দিকে পা বাড়িয়েছিলো এই ছেলেমেয়েগুলো। টিভিতে পরিস্থিতি জেনে দূর দূরান্ত থেকে আসতেই ভয় পাচ্ছিলো অনেকে।প্রথম ব্যাচের যারা ক্লাশ স্থগিত ছিলো অনেকদিন। শহর জুড়ে জরুরী অবস্থা।দূর্বিষহ সময়ের স্মৃতিগুলো পিছু ছেড়েছে কতটা সেটা অস্পষ্ট তবে মনে রাখতে চায়না কেউই। ভয় শংকা কাটিয়ে উঠেছে অনেকটাই। হয়তো পুরোপুরিই। এখানে এখন শুধু শিক্ষকদের স্নেহ, শাসন সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যকার ভালোবাসার গল্পগুলোই ভাসে।
কেবল কি পড়াশোনা ? পাহাড় ধ্বসের সময়টায় এই ছেলেমেয়েগুলো ছুটে গেছিলো জীর্ণ মানুষগুলোর কাছে,আর্থিক সহায়তায়। প্রতি জাতীয় দিবসে নিজ কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজন করে ফ্রী ব্লাড গ্রুপিং টেষ্ট। নাচ গান বিতর্ক চর্চায় ও যথেষ্ট সরব তারা। মানিয়া,স্নেহাশিস,তন্ময়,অনুপমের,মিতুর মত তুখোড় বিতার্কিক রয়েছে এই ক্যাম্পাসেই।
তৃতীয় বর্ষের কুশ অনর্ব সহ কয়েক বন্ধু মিলে চেষ্টা করছে একটি নতুন কার্যক্রমের ‘অনুরণন’ নামে শিক্ষার্থীদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক কোচিং ক্লাশের।
দুপুর অব্দী ক্লাশ তারপর সন্ধ্যে বিকেলে বন্ধুরা সদলবলে ঘুরাঘুরি। ২০১৪সালের ১০জানুয়ারী যাত্রা শুরু করা রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের প্রথম বর্ষের ক্লাশ শুরু হয়েছিলো তিনমাস পড়ে। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজ দেখতে দেখতে পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ। প্রতি সেশনে আসন সংখ্যা ৫১ কোটা সংখ্যা ২৫%। বাঙালী ৩ পাহাড়ি ১৪জন। বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা চার ব্যাচে ২০০। আছে অনার্স মার্কস(মেডিকেলের সিস্টেমে সর্বোচ্চ নাম্বার) প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীও। নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্টার প্রক্রিয়া চলমান,তবে সময় সাপেক্ষ।
পাহাড়ের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপিঠ নিজের নাম নিজের চ্যালেঞ্জ অক্ষুন্ন রেখেছে প্রতিটি পদক্ষেপে। রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ সগৌরবে এগিয়ে যাক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে। পার্বত্যবাসীর গর্ব এই মেডিকেল কলেজ সমন্বয় করবে উন্নয়ন এবং উন্নত চিকিৎসার এমন প্রত্যাশা সাধারণের।
স্বপ্নের রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাবে আরো বহুদূর….প্রত্যাশায়, ভালোবাসায়…..

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
সমার্থী রায়
Guest

Tania Akter

দিয়া অদ্বিতীয়া
Guest

Shamima Afroz Mitu