জীবন গানের পাখি `রেজাউল’


তানিয়া এ্যানি প্রকাশের সময়: মার্চ 18, 2018

জীবন গানের পাখি `রেজাউল’

বছর বিশেক আগে মেয়ে সাত বছরের রুপালী আর ছোট্ট রুবেলকে সাথে নিয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতা আরো খানিকটা উন্নত জীবনের আশায় পৈত্রিক ভিটা বাড়ি ছেড়ে এই পাহাড়ী শহরে এসে ভাড়া বাড়িতে বসত বুনেছিলেন হাবিবুর রহমান সুফিয়া বেগম দম্পতি।ভেবেছিলেন যা ঘটেছে তার উল্টো।অচেনা অজানা এই শহরে কোনমতে মাথা গোজার ঠায় হলেও করবেটা কি!!হাবিবুর রহমান বেছে নিলেন দোকানের মালামাল পৌঁছে দেয়ার হিসেবে দিনমজুরের কাজ।দিনে আনে দিনে খায় সংসার।টানাপোড়ন চলছেই।ছোট দুটি বাচ্চা।নিজেকেও কিছু করতে হবে সে ভাবনা থেকেই নিজের কানের দুল বন্ধক রেখে কিছু টাকায় কাপড়ের ব্যবসায় নেমে পড়লেন সুফিয়া বেগমও।শহর থেকে কাপড় কিনে এনে স্থানীয় দোকানে সরবরাহ করতেন তিনি।প্রতিবেশির পরামর্শে সদস্য হলেন ক্ষুদ্র ঋন প্রদানকারী এনজিও/সমিতির সাথে।সমিতি থেকে ঋন নিয়ে সেলাই মেশিনও কিনলেন।ব্যবসার পরিসর খানিকটা বড় করে নিজেই ঘরে জামা সেলাই করে সেগুলো সরবরাহ করতেন দোকানে।স্বামী স্ত্রী দুজনের আয়ে চলছে সংসার।এরইমধ্যে জন্ম হলো ছোট সন্তান রুবেলের।সেলাইয়ের দিনগুলোতে সংসারে খানিকটা স্বচ্ছলতা আসলেও বেড়েছে খরচও।বড় ছেলে রুবেলের অদম্য ইচ্ছে পড়াশোনায়।বড় মেয়েকে বেশিদূর পড়াশোনা করাতে পারেননি। বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন অল্প বয়সেই।কিন্তু ছেলেটার ইচ্ছে ডিঙোতে চাননি কোনভাবেই।এরইমাঝে কিছু সঞ্চিত টাকায় নিজেদের এক টুকরো ভিটে হলো শহরের শিমুলতলী এলাকায়।নিজেদের বাড়ি।আনন্দ ছিলো।ছিলো ভাবনাও।আবারো সেই টানাপোড়ন।আগেরমত জমছে না কাপড়ের ব্যবসাও।এখন আর শহরে যেয়ে কাপড় আনতে পারেন না তিনি।আর সমিতির ঋনের বিপরীতে শোধের ভারটা আরো তীব্র।আস্তে আস্তে সরে গেলেন সমিতি থেকেও।টানাপোড়ন আছেই।স্বামী হাবিবুর রহমান এ দোকান ওদোকানের মাল টেনে যা আয় করেন তাতেই চলে সংসার।রুবলের ছোট ভাই হৃদয় পড়ছে সপ্তম শ্রেনীতে।
পড়াশোনার প্রতি সীমাহীন ইচ্ছেশক্তির জোরে টানাপোড়নের সংসারেও সফল ভাবে এসএসসি শেষ করে ২০১৭তে শেষ এইচএসসি।স্বপ্ন গাথা আরো অনেকদূরের।এরইমধ্যে এক রাতে সর্বনাশীরূপে হাজির বৃষ্টি।১৩জুন।রাঙামাটি ট্র‍্যাজেডির সেই পাহাড় ধ্বস।চারপাশে থেকে পাহাড় ধ্বসে এসে পড়েছে হাবিবুর রহমান সুফিয়া বেগমের এক টুকরো ভিটের উপর।ভাগ্যের কি লীলা।দুমড়ে মুচড়ে যায়নি ঘরটা।অবশ্য ক্ষতিও কম হয়নি।অন্ধকার বিভীষিকার সেই ভোরটা কেমন ঘোরেই নাই করে দিয়ে গেলো সব।আশেপাশে সব মৃত্যপুরী।বেশ কদিন থাকতে হয়েছেও আশ্রয়কেন্দ্রে।তবুও সকাল বিকেল এসেছেন নিজ ভিটায়।আস্তে আস্তে শংকা কাটিয়ে ফিরেছেন নিজ ভিটায়।
এইচ এস সি শেষ করা রুবেলের চোখে মুখে জেগে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন খানিকটা মুষরে পড়লেও হারাতে চায়নি স্বপ্ন।কিন্তু কোচিং করতে যে টাকা লাগবে তা পাবে কই!কোচিংয়ের আশা বাদ দিয়ে নিজে নিজেই পড়ায় লেগে গেলো রুবেল।পরীক্ষা দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছিটকে গিয়েছিলো অল্প নাম্বারের ব্যবধানে কিন্তু ভাগ্য টেনে নিয়ে আসলো তাকে চটগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে।লিখিত পরীক্ষায় টিকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও নিজের গানে পরীক্ষকদের মুগ্ধ করে টিকে গেছে রুবেল।মো.রেজাউল করিম রুবেল।দিনমজুর হাবিবুর রহমান এবং সুফিয়া বেগম দম্পতির বড় ছেলে পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়ের সংগীত বিভাগে।সংগীতের প্রাতিষ্টানিক শিক্ষা!নাহ নেই,কোনদিন হারমোনিয়ামটাও বাজানোর সুযোগ পাননি!!আশেপাশে দোকানে গান বেজেছে শুনেছে।গীতিকাব্যের শহর ময়মনসিংহে বেড়ে উঠা তার পিতা হাবিবুর রহমান এবং চাচাদের মুখে মুখে শুনতেন গান।গ্রামের বাজারে গ্রাম্য আয়োজনে খালি গলায় গানের আসর জমাতো বাবা চাচারা।গ্রামের বাড়ি গেলে বাপ চাচাদের সাথে সাথে হাজির হয়ে যেত এইসব আসরে।সেখানে গান শুনে শুনেই গানের প্রতি নেশা ছোট্ট রুবেলের।রুবেল নিজেই বলেন রক্ত মিশে থাকা এই গানই হয়তো আমাকে এই বিভাগে টেনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রথম দিন গুলোতে খানিকটা খারাপ লাগা কাজ করতো।সবাই কত শিখে পড়ে এসেছে আর আমি!!তবে সে খারাপ লাগা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাহায্য এবং অমায়িক আচরনেই কেটে গেছে সেই আক্ষেপ।এখন রুবেল স্বপ্ন দেখেন সংগীত কে সাথে করে সামনে এগুনোর।ভালো রেজাল্ট করে ভালো কোন জায়গায় সংগীতের শিক্ষক হিসেবেই কাজ করতে আগ্রহী রুবেল।স্বপ্ন দেখেন পাশ করে বের হলে নিজের সামর্থ্য হলে খুলবেন নিজের একটি সংগীত শিক্ষালয়।
পড়াশোনা গন্ডি ছুতে পারেনি রুবেলের বাবা মা কেউই।মা সুফিয়া বেগম বুঝেনও না ছেলে এটা কি পড়ছে এটা পড়ে কি হবে।তিনি শুধু জানেন আমার চুপচাপ লাজুক এই ছেলেটার পড়াশোনায় প্রচন্ড আগ্রহ।এবং ছেলে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাক।ছেলে সংসারের হাল ধরলে হয়তো খানিকটা স্বচ্ছল হতো পরিবার কিন্তু ছেলের পড়াশোনার আগ্রহের কোনভাবে ছেদ ফেলতে চাননা মা বাবা কেউই।
ধার কর্য করে বিশ্ববিদ্যলয়ে পরীক্ষা দিয়িয়েছেন ছেলেকে।সেই ছেলে টিকেও গেলো ভর্তি পরীক্ষায়।ভর্তি হতে যেয়ে আবারো বিপত্তি।ভর্তির অতগুলো টাকা!
তবুও কিছু ভালো মানুষ থাকে আমাদের আশেপাশেই।তাদেরই সহায়তায় ভর্তি সম্পন্ন হলো ভালোভাবেই।
ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে মোটামুটিভাবে।ক্লাশের চাপ কম থাকায় প্রায়ই বাড়ি চলে আসে রুবেল।ক্যাম্পাসে এক রুমে ভাড়া থাকে দুবন্ধু সহ।খাওয়া দাওয়া বাইরে।ক্লাশ না হলে শুধু শুধুই ওখানে না থেকে খরচটা বাচাতে বাড়ি চলে আসে রুবেল।
নিজের উদম্য ইচ্ছে শক্তি আর বাবা মায়ের ছায়ায় দোয়ায় যাত্রাটাতো শুরু হয়েছে কিন্তু ভাবনার দোটানা ক্লাশ পুরোদমে শুরু হয়ে গেলে থাকতে হবে টানা।বাড়বে খরচ।মাসে অন্তত ৩/৪হাজার টাকা।কোথা থেকে আসবে টাকা।দিনমজুর বাবা কোথায় পাবে এত টাকা।নিজের খরচ টুকু নিজে চালাতে পারার চেষ্টায় এখন থেকেই লেগে পড়েছে অন্তত দুএকটা টিউশন যদি পাওয়া যায়।
একই চিন্তা রুবেলের মা সুফিয়া বেগমের চোখে মুখেও।কোথা থেকে এনে দিবো ছেলের হাতে মাসে এতগুলো টাকা।বয়স হয়েছে এখনতো সেলাই মেশিনটাতেও বসা হয়না খুব একটা।কাজ নেনেই।নিজেরও আয় নেই।তবুই ভরসা হারান না।ছেলে পড়বেই।এত পথ যেহেতু এগুতে পেড়েছে ছেলে বাকিপথটাও ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে।তবে…কিভাবে জানা নেই কারোই!
ভীষন লাজুক স্বভাবের সম্ভাবনাময়ী রেজাউল রুবেলের কাছে আবদার গান শুনবো!লজ্জ্বায় লাল হয়ে গেছে ছেলে।বাংলাদেশের জয়ের আনন্দে গলা ফাটিয়ে চিৎকারে গলা ভাঙা আপাতত।তবুও খুব একটা জোর করতে হলোনা,নিজেই আগ্রহী হয়ে শুনালো গান।কেবল শুনে শুনেই শিখে নেয়া তাল লয় সব সউব।আহ মুগ্ধতা….

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

avatar
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Prarthi Ghosh
Guest

Ashru Mony
Gayatri Chakraborty
অজান্তা দাশ টুম্পা
চায়না পাটোয়ারী

Gayatri Chakraborty
Guest

Wow,,