জলে ভাসা পদ্ম জীবন…..


তানিয়া এ্যানি প্রকাশের সময়: নভেম্বর 21, 2017

জলে ভাসা পদ্ম জীবন…..

বোটের বাড়ন্ত গতির সাথে সাথে যেন দূর থেকে হাতছানি দিতে থাকে শহর রাঙামাটি,উঁচুতে ফুরোমন।পাহাড়ের কোল ঘেষে উঁকি দিচ্ছে সভ্যতা।দালান কোঠা।আপনি ভাসছেন জলে।লেকে।কাপ্তাই লেকে।স্বচ্ছ রোদের প্রতিচ্ছবি ফুটে আছে লেক জুড়ে।৭২৬ বর্গ কিমির দক্ষিন এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ এই লেকের এই সময়ের চেহারাটা ভিন্ন।একদম স্বছ জলের চিত্রটা মিলিয়ে যায় কিছুদূর গেলেই,পাহাড়ি ঢলের কারণে জল ঘোলাটে।তবে লেক ঘিরে গড়ে উঠা জমা জনজীবন পাহাড়ী এই লেকের সৌন্দর্য ম্লান হয়না কিছুতেই।মে,জুন,জুলাই তিনমাস বন্ধ থাকার পর আগষ্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে গেছে কাপ্তাই লেকে মৎস্য আহরন।এখানকার জেলেদের জন্য মোটামুটি রকমের উৎসবের সময় বলাই যায়।শহরের হাতছানির মায়া কাটিয়ে লেকে চোখে ফেরালে দেখবেন জলের উপর বাঁশের মাচাং!ছোট বড়।একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন ওই মাচাং ঘিড়েই আছে ছড়িয়ে আছে জাল।মাছের জাল।এগুলোকে বলে টোপ।জেলেদের একাংশ নিয়মিত এখান থেকেই জাল ছাড়ে নির্ধারিত সময়ে, তোলার সময়ও নির্ধারিত।যত এগুবেন দেখবেন এপাশে ওপাশে ডিঙি নৌকা বিশাল বিশাল নৌকায় চলছে মাছ বন্দীর উৎসব।বলা হয়ে থাকে কাপ্তাই লেকে মাছ ধরার জন্য মোটামুটি ২২ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহ্রত হয়।যদি ভরা লেকের বুকে জালই মাছ ধরার অন্যতম মাধ্যম।ব্যাক্তি মালিকাধীন জাল খুব বেশি বড় না হলেও সওদাগরের অধীন জাল হয় বড়।মোটামুটি জাল টেনে তুলতে লেগে যায় ৮/১০ জনের মত জেলে।এবারের অতি বর্ষা আর পাহাড়ি ঢলের কারণে লেকের জল এমনিতেই বেশি।লেকের ভরা মৌসুম চলছে বলা চলে।জাল ফেলা থেকে জাল তোলা অব্দিই কেবল নয় মাছ ধরার এই পুরোটা সময় জুড়েই জেলেদের জীবন এই হ্রদের বুকেই।থাকা খাওয়া সব।বিশাল বিশাল নৌকোয় উনুনে চলে রান্না বান্না।অনেকে আবার লেকের ধারের আশেপাশের পাহাড়ে গড়ে অস্থায়ী নিবাস।শুধু শহরের নয় শহরের বাইরের দূর দূরান্ত থেকে আসা জেলেদের দেখাও মিলে এই সময়টায়।এই সময়টার সবচেয়ে মজার ব্যাপারই হচ্ছে আপনি যে সময়ই লেকে নামেন না কেন আপনি জেলে জীবনের একটি আদর্শ চিত্র পেয়ে যাবেন।চাইলে লেকের মাঝে কাছ থেকেও দেখতে পারেন জালে মাঝ ধরার প্রক্রিয়া,জাল ভর্তি একদম সতেজ সব ছোট বড় মাছ।তবে যারা সওদাগরের অধীনে জেলে হিসেবে কাজ করে অধিকাংশই মাছ ধরার আদর্শ সময় হিসেবে বেছে নেয় রাত ৮ থেকে ভোর অব্দি।ভোর সকালে সেসব মাছ পৌঁছে যায় ফিশারীতে সওদাগরের কাছে।আর ব্যক্তিমালিকানার মাছ চলে যায় শহরের স্থানীয় সব বাজারে।তাই ফ্রেশ মাছ পেতে হলে বাজারে হানা দিতে হবে ভোর সকালে অথবা বিকেলে।২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই লেকের মাছের উপরেই সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮ কোটি ৩৫লক্ষ টাকা।আগের অর্থবছরে যা ছিলো ১০কোটি ৬১ লক্ষ।দু:খজনক হলেও সত্যি মাছের চারনভূমি এই লেক থেকে ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে নানা প্রজাতির মাছ। ড্রেজিংয়ের অভাব,পানি দূষন,ডিম পারার সময় মাছ ধরা নানা কারণে বর্তমানে রুই,কাতলা,মৃগেল,পাবদা,বড় চিতল জাতের মাছও প্রায় ক্রমহ্রাসমান প্রজাতির মাছের লিস্টে চলে গেছে।বিলুপ্ত হয়েছে সীলন,ঘাউরা,বাঘাইর,দেশি সরপুঁটি।তাছাড়াও বড় একটি কারণ হিসেবে আছে জালের আধুনিকায়ন।যে জাল কাথা জাল নামেও পরিচিত।অনেকটা কারেন্ট জালের মত এই জালে আটকা পড়ে যায় বড় থেকে পোনা সবধরনের মাছ।লোকমুখে জানা যায় একটা সময় চাঁদের রাতে লেকের স্বচ্ছ জলে ভেসে উঠতো বড় বড় কাতলা।সেই কাতলাও এখন ক্রমহ্রাসমান।সরকারী ব্যবস্থাপনায় লেকের কিছু কিছু অংশ মাছের অভয়ারণ্য হিসেবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা আছে সারাবছরের জন্যই।মাছের বিলুপ্তি রোধেই এই ব্যবস্থা।কাপ্তাই লেক জল জলজ জীবন দেখতে হলে আপনাকে আসতে হবে এই সময়টাতেই।উপরে শুভ্র মেঘের আকাশ আর জলে মৎস্য জীবন।বোটে বসে মন্দ কাটবেনা সময়।শহরের তবলছড়ি অথবা রিজার্ভ বাজার ঘাটে পেয়ে যাবেন ঘন্টা হিসেবে বোট ভাড়ায়।জেলে জীবন আর মাছের উৎসবের জন্য কাট্টলি বিল সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হলেও শহরের আশপাশও আশাহত করবেনা আপনায়।কেবল জেলে জীবনই নয় মস্ত লেকে ডিঙি নৌকে নিয়ে ছুটতে দেখবেন সদ্য কৈশোরে পা রাখা ছেলের নৌকোয় বাবাকেও।ছোটখাট জাল নিয়ে হাজির তারাও মাছের সন্ধানে।কেউ কেউ জাল ফেলছে একাই।ব্যক্তিমালিকানাধীন নৌকা থেকে মাছ কিনে নিয়েও ঘরে ফিরতে পারেন আপনিও,সতেজ মাছ……আমাদের হ্রদের মাছ

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz