ছয় পেরিয়ে সাতে পা ‘জীবন’র


ইয়াছিন রানা সোহেল প্রকাশের সময়: নভেম্বর 11, 2017

ছয় পেরিয়ে সাতে পা ‘জীবন’র

রক্ত নিয়েই কাজ কারবার তাদের। বিপন্ন মানুষের রক্তের প্রয়োজনে রাত দিন যেনো একি সমান তাদের কাছে। কারণ তারা বোঝে রোগির রক্তের প্রয়োজনের তীব্রতা। এই প্রয়োজনটা বোঝার পিছনেও রয়েছে এক করুন ইতিহাস। এক বীর মুক্তিযোদ্ধার রক্তের প্রয়োজনে হন্য হয়ে ঘুরে এদিক সেদিক। কোথাও মিলেনি রক্ত। রাঙামাটি হাসপাতালেও না। অবশেষে রক্ত মিলে, চিকিৎসাও হয়, তিনি সুস্থও হন। কিন্তু সেই দিনের কষ্টের কথাটা মাথায় গেথে তাকে তাঁরই সুযোগ্য সন্তান মানুষ গড়ার কারিগর আনোয়ার কবির পাটোয়ারীর। তাঁর শিক্ষার্থীদের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও করেন। মানুষের প্রয়োজনে কিভাবে সহজে রক্ত সরবরাহ করা যায়। এই ভাবনার ফাঁকেই ঘটে যায় আরেক হৃদয় বিদারক ঘটনা। সময় মত রক্ত না পাওয়ায় চির বিদায় নিতে হয় পাটোয়ারীর শিক্ষার্থী মিকির নানাকে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই অভিজ্ঞতা প্রবলভাবে নাড়া দেয় দুজনকেই। জরুরী মুহুর্তে রক্তের প্রয়োজনে আলোচনা-পরিকল্পনা সাজাতে থাকে দুজন। সাথে যোগ দেয় মোঃ আশফাক হোসেন, মেহের নিগার চৌধুরী, গায়ত্রী চক্রবর্ত্তী, উৎস দাশ, আবু সুফিয়ান আফসান ও অমিরাজ দাশ। এই আটজনের সমন্বয়ে ২০০৮সালের ফেব্রুয়ারীতে গঠন করা হয় ব্লাড ডোনার সংগঠন। প্রথমে নাম দেয়া হয় ‘দুরন্ত’। ধীরে ধীরে চলতে থাকে সংগঠনের কার্যক্রম। বাড়তে থাকে এর ব্যপ্তি, সংগঠনও পায় গতি।
একসময় দুরন্ত নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় ‘জীবন’। আর এটিই তিন পার্বত্য জেলার অনলাইন ভিত্তিক ব্লাড ডোনার সংগঠন। ১১-১১-২০১১খ্রি: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জীবন’র ফেইসবুক পেইজের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জরুরী রক্তের প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয় নিজস্ব মোবাইল নাম্বারও। যেটি দিনরাত চব্বিশ ঘন্টায় খোলা থাকবে আর ফোন করলেই রিসিভ হবে। সংগঠনের সদস্যরাও একেক সময় একেক জন এই সীমের দায়িত্ব পালন করে। এরই মধ্যে সংগঠনে যোগ দেয় নতুন মুখ। শহীদুল ইসলাম রাশেল, নিশু, কাউছার, শাহেদা, সামিয়া, সীমা, টিনা, জারিন, অশ্রু মনি। সদস্য সংখ্যা ৮ থেকে বেড়ে হয় ৫২ জনে। দিনদিন বাড়তে থাকে ব্লাড ডোনারের সংখ্যাও। প্রতিবছর গড়ে ডোনার বাড়ে প্রায় সাত শতাধিকে। আর এরই মধ্যে ডোনেট করা হয় প্রায় পাঁচ সহ¯্রাধিক রোগিকে।
ব্লাড ডোনারের পাশাপাশি নানা সামাজিক কাজেও ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। পাহাড়ধসের ঘটনায়ও এরা ছিল সদা তৎপর। মুমুর্ষ রোগিকে রক্ত ব্যবস্থা করে দেয়ার পাশাপাশি উদ্ধার কাজেও ছিল তারা সামনের কাতারে। আবার উদ্ধার শেষে হতাহতদের জরিপ কাজে কিংবা অসহায় মানুষগুলোকে সহায়তা দিতেও দিনরাত পরিশ্রম করেছে ওরা।
শিক্ষার্থীদের মাঝে রক্তের সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও করা হয় জীবন’র শাখা। না কারো দান-অনুদানে চলে না এই সংগঠন। সদস্যদের সামর্থ অনুযায়ী অর্থ সহায়তা দিয়েই চলে সংগঠনের নানামুখি সেবামুলক কার্যক্রম। দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষগুলো সেবায় এরা সারা বছরই থাকে তৎপর। পাহাড়ের আঙিনা ছেড়ে সংগঠনের ব্যপ্তি ছড়াই সমতলের জেলাতেও। শহরের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি চট্টগ্রামেও রয়েছে একটি শাখা। বর্তমানে জীবন’র ডোনারের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজারের অধিক।
ছয় বছর পেরিয়ে এই সংগঠন পা দিল সাত বছরে। বর্ষপুর্তির আয়োজনটাও ছিল ব্যতিক্রম। সকালে বর্ণাঢ্য র‌্যালীর আয়োজন করা হয়। র‌্যালী শেষে করা হয় শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। বিকেলে রাঙামাটি শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আনোয়ার কবির পাটোয়ারীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পৌর মেয়র আকবর হোসেন চৌধুরী। সংগঠনের সাধারন সম্পাদক সাজিদ বিন জাহিদের পরিচালনায় এতে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, ডা. নিহার রঞ্জন, প্রেস ক্লাব সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন রুবেল ও আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ জাহিদ আকতার। আলোচনা সভা শেষে বর্ষপূর্তির কেক কাটা হয় ও বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। পরে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
মানবতার সেবায় সবসময় অসহায় মানুষের পাশে থাকবে ‘জীবন’-এমনটাই অঙ্গীকার সকল সদস্যদের।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
wpDiscuz