বিধির বিধান

কোথায় যাচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থা?


॥ মো. মোস্তফা কামাল ॥ প্রকাশের সময়: নভেম্বর 3, 2017

কোথায় যাচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থা?

কোথায় যাচ্ছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থা? প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা সর্বত্র শুধুমাত্র হতাশা আর হতাশা। এই হতাশার মধ্যে কিভাবে এগোবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের কারো কি করার কিছু নেই? আজীবন শুধু শিক্ষার সমস্যার কথাই শুনতে হবে? সমাধানের পথে কি আমরা এগুতে পারবো না? আর সমস্যার সমাধানের পথে যদি এগোতে না পারি তাহলে শিক্ষার সমস্যার কথা বলে কি লাভ? চলতে দিন চলছে যেমন। তবে এখানেও সমস্যা এভাবে চলতে দিলে আমাদের আগামীর অবস্থা কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে? সেটিও ভেবে দেখতে হবে। সমস্যা সমাধানের জন্য যাদের ওপর বেশি দায়িত্ব বর্তায়, তারা যদি এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে না আসেন তাহলে এই করুণ অবস্থার দায় থেকে আমরা কেউ মুিক্ত পাব না। অতত্রব এখনো সময় আছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এই বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করুন।

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অচলাবস্থার বিষয়টি দীর্ঘদিনের। তবে এই শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা না হলেও মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সভা সেমিনারে আলোচনায় উঠে আসে শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র। প্রতিবছর মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক কিংবা ¯œাতক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ফলাফল চিত্র আমাদের জন্য লজ্জাস্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। আর ফলাফলের এই চিত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া না হলেও জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিদের পড়তে হয় বিব্রতকর অবস্থায়। বিভিন্ন সভায় জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তিরা ফলাফলের এই করুণ চিত্র নিয়ে ক্ষোভ এবং লজ্জা প্রকাশ করলেও যাদের লজ্জা পাওয়া উচিত তারা কিন্তু এই ভেবে আনন্দে থাকেন যে, ছাত্র-ছাত্রী ফেল করেছে কিংবা ভাল ফলাফল করেনি তাতে আমাদের কি? আমরা তো আমাদের সুযোগ সুবিধা নিয়মিত পাচ্ছি। অতএব ——- ?

২৬ অক্টোবর রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদের সপ্তম শ্রেণির বিশেষ বৃত্তি পরীক্ষার বৃত্তি বিতরণী অনুষ্ঠানের দুই মূখ্য ব্যক্তি রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব বৃষকেতু চাকমা এবং জেলা প্রশাসক জনাব মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান তাদের বক্তব্যে পার্বত্যজেলার শিক্ষার মান নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন তা যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে সহজেই বুঝা যাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোথায় যাচ্ছে।

জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান মহোদয় তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টত বলে দেন যে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে জেলা পরিষদের মাধ্যমে সপ্তম শ্রেণির বিশেষ বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল সে উদ্দেশ্য বাস্তবে রুপ নেয়নি। মেধাবি শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়নের জন্য এই শিক্ষা বৃত্তি চালু করা হলেও মেধাবি শিক্ষার্থীর সংকট দেখা দিচ্ছে। কাজেই ভবিষ্যতে এই বৃত্তি আদৌ চালু রাখার প্রয়োজন কিনা সে বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে। জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রতি বছর ৭ হতে ৮ লক্ষ টাকা খরচ করে এই বৃত্তি পরীক্ষা পরিচালনা করার বিষয়টি যে এখন অনিশ্চিত সে বিষয়ে তিনি ইঙ্গিত প্রদান করেন। তাঁর বক্তব্যে আমাদের এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্র উঠে আসে।

জেলা প্রশাসক মহোদয় সরাসরি বলেন, রাঙামাটির মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষায় প্রতিবছর যে ফলাফল হয় তা আমাদের জন্য লজ্জাস্কর। এটি কোনমতেই একটি জেলার কাক্সিক্ষত ফলাফল হতে পারে না। বিভিন্ন বৃত্তি পরীক্ষায় জেলার শতাধিক স্কুলের মধ্যে তিন হতে ৪টি স্কুল ছাড়া আর কোন স্কুলের ফলাফল উল্লেখ করার মতো থাকে না। এমনকি জেলা সদরে অবস্থিত জেলার সরকারি বিদ্যালয় এবং অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে সকল সরকারি সুবিধা থাকা সত্বেও ফলাফলের করুণ চিত্র দেখা যায়। এটি দুঃখজনক। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বর্গা শিক্ষক ব্যবস্থার বিষয়টি এই সময়ের জন্য দুর্ভাগ্যজনক বলেও মনে করেন তিনি। তিনি তাঁর বক্তব্যে এখানকার সকল স্তরে শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ চিত্রে হতাশা ব্যক্ত করেন।

বৃত্তি বিতরণী অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা প্রশাসক মহোদয়ের বক্তব্যের সূত্র ধরে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে জেলার কর্ণধার এই দুই কর্তা ব্যক্তি এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তাদের যে মতামত দিয়েছেন বাস্তবে এই অবস্থা আরো খারাপ।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক চিত্র পর্যালোচনা করলে যে চিত্রটি সবার আগে ভেসে আসে তা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার শতভাগ আন্তরিক। সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি বিদ্যালয় ও কলেজের জাতীয়করণের যে তালিকা সে তালিকায় এই জেলার একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণের ক্ষেত্রে অনেক বিদ্যালয় প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করলেও স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহানুভূতির কারণে কয়েকশত প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয়েছে। বছরের প্রথম দিন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্য বই পৌঁছিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে ¯œাতক পর্যায় পর্যন্ত বৃত্তি অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারি উদ্যোগে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। আবাসিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হচ্ছে কলেজগুলোতে অনার্স হতে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত নতুন নতুন সাবজেক্ট দেয়া হচ্ছে । সরকারের আর কি করার আছে? অভিযোগ থাকে প্রতিবছর এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার আগে বিভিন্ন বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে বিশেষ কোচিং এর নামে অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অংকের কোচিং ফি আদায় করা হচ্ছে এমনকি কতিপয় স্কুলে সারা বছর কোচিং ফির মাধ্যমে কোচিং চালু আছে, কিন্তু এইসবের আউটপুট কী?

শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে বছরের সিংহভাগ সময় এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। আর শিক্ষা সম্পর্কিত সভা-সেমিনার কিংবা এনজিওদের কার্যক্রম এগুলোতেও অগণিত। কিন্তু ফলাফল কী হচ্ছে?

আমাদের পার্বত্য জেলা রাঙামাটির শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভূত সওয়ার হয়েছে। কাজেই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য এসব ভূত তাড়াতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুঁজি করে যারা ব্যবসায় নেমেছেন তাদের খুঁজে বের করতে হবে। মুক্তির উপায় খুঁজে বের করতে হবে। নতুবা আমাদের জন্য খুব খারাপ সময় আসছে।

লেখক: সিনিয়র সংবাদকর্মী ও অধ্যক্ষ, রাঙামাটি শিশু নিকেতন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Top advertise


এই সংবাদটিতে আপনার মতামত প্রকাশ করুন

Notify of
avatar
Sort by:   newest | oldest | most voted
HoRish ChanDro KarBari
Guest

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ আ দুর্নীতি হওয়াই একজন ছাত্রের বেইজড /মুল /গোড়া দুর্বল হয়ে গড়ে উঠে তাই কাঙ্খিত ফলাফল আসে না।
কারণ, প্রাথমিকের ছাত্ররা তাদের পাঠদানের জন্য যোগ্য/মানসম্পন্ন শিক্ষক পাই না।

Suman Dey
Guest

শিক্ষা আর স্বাস্থ্য এই দুটি বিষয়ে অবহেলা কাম্য নয়।

সুমেধ চাকমা
Guest

এখানে জেলা পরিষদের শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যকে সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। শিক্ষার এই বেহাল দশার জন্য প্রধানত জেলা পরিষদই দায়ী। দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে ঘুষ নিয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষার প্রথম স্তরকে ধ্বংস করা হয়েছে।

wpDiscuz