নীড় পাতা / ফিচার / খোলা জানালা / এ এক অন্য জীবনের গল্প

এ এক অন্য জীবনের গল্প

পার্বত্য শহর রাঙামাটির বনরূপা মোড়ে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত শীতকালিন চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা বিক্রি করেন লোকটি। সাদামাটা, কথাও কম বলেন বা বলার সময় পাননা অথবা বলেন না। পিঠা বিক্রিই যেনো তার একমাত্র কাজ। মাঝে মাঝেই পিঠা খাওয়া হয় তার ভ্রাম্যমান দোকানে, কোন কথা হয়নি কখনো, ২২ নভেম্বর বেশ আলাপচারিতা হলো এই সাধারন মানুষটার সাথে, সেটাই তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য………..

চাচা বেচা কেমন??
এতো বাবা কোন মত হয়, দৈনিক ৮০০ থেকে ১২০০ টেকা, লাভ থাহে তিন চারশ টেহা।

ছেলে মেয়ে কয় জন?
হেইডা একটু বেশিই, ৪ পোলা, ৩ মাইয়্যা, আগে বুজিনাই, অহন বুজি ভুল করছি।

বিয়ে করেছেন কত সালে??
হেইডা মনে নাই তয় মনে হয় ৪০ বছর হইবো।

আপনার বয়স কত? নাম কি? আর চাচির নাম কি, বয়স কত?
কত হইবো, তয় সংগ্রামের সময় বুঝের আছিলাম, পাশে থাকা চাচি বলে উঠলেন, হের বয়স ৬০ এর উপরে ২, আর আমার ৫০ এর ১ কম। আমার নাম ফজিলা বেগম হের নাম আব্দুল লতিফ।

ছেলে মেয়েরা পাড়া লেখা করে?
না বরডি করে নাই, অনেক চেষ্টা করছি, মাষ্টার রাখছি হের পরেও পড়ে নাই, ফোর ফাইভ পাশ কইরাই শেষ, বেপথে গেছেগা, বর দুই পুলা বিয়া করছে, দুই মাইয়ারে বিয়া দিছি, আর ছুড মাইয়াডা এইটে (৮ম শ্রেণী) পড়ে, বেকতের ছোড পুলাডা ফোরে পড়ে, এডাও দেহি বরডি মত বান্দ্রামি শুরু করতে চায়, কি করমু কন? আমরার মা বাবায়তো আমাগোরে কোনদিন পড়ার কথা কয় নাই, তাই আইজ চোখথাক্যাও আন্ধা, কিন্তু আমারডিরে তো ইচ্ছা থাকন সত্যেও পড়াইতে পারতাছিনা। তয় ছোড দুইডা যদি মন দিয়া পড়ে তাইলে জান দিয়া অইলেও ওগো পড়ামু বাকিডা আল্লার হাতে।

গ্রামের বাড়ি কোথায়?
আগেতো মমিনসিং আছিলো অহন অইলো শেরপুর জেলা, নাইলতাবাড়ি।

দেশে জায়গা সম্পত্তি আছে?
না তেমন নাই অল্প একটু ধানি জমিন আছে, আর কিছু নাই।

রাঙামাটি কখন এসেছেন জায়গা আছে??
আমলিক সরকার প্রথম যেই বার পাশ করছিল তার এক বছর বাদে ( মানে ১৯৯৭ সালে)। জাগা পামু কই, ভাড়া বাসায় থাকি, ভাড়া দিতে অনেক কষ্ট হয়, ৪৫০০ টেকা ভাড়া, আগে এই বাসা ভাড়াই আছিল ১৫০ টেকা, আর কামাইও ভালো আছিলে, শরিরে শক্তিও আছিল, আর অহন কামাই কমছে শরিরের শক্তি কমছে আর বাসা ভাড়া বাড়ছে।

সারা বছর কি পিঠাই বেচেন ??
না যখন যা পাই তাই করি যেমন, আনারসের সময় আনারস কাইট্যা বেচি, আম কাঁডালের সময় আম কাঁডাল, এহন পিঠা, ভাইসা ভাইসা বাইচা থাকা। আগে লাকড়ি বেচতাম এহনো বেচি তয় গ্যাসের দাম কমাতে মানুষ আর লাকড়ি কিনেনা, দামও কইমা গেছে।

ছেলেরা দেখেনা ?
পোলাপান জন্ম দিয়া ভুল করছি, এইতা পোলাপান থাকার চাইতে না থাকাই ভালো, আমাগো দেহার সময় হেগো নাই, নিজের সংসার আর শ্বশুর বাড়ি লইয়া ব্যস্ত, আমাগো কয় হেগো ভবিষ্যত আছেনা, হেরা হেগো মত থাকে। আর টেকা পয়সার টান পরলে আমাগো কাছে আহে, আমি চাইলোও, চাচি মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে বলেলেন, ওরা ভুল করলেও কি আমরা করতে পারমু, আমাগো পোলানা, পেটে লইছিনা হেগোরে কি ফেলাই দিতে পারমু।

চাচা একটু আপনাগো এলাকা কথা কন? ওখানে কোন দল জিতে??
আমরা আমলিক বিমপি বুঝিনা, সবাই মতিয়া আপারে ভোট দেই, হেয় পাশ করে, মানে আমরার এমপি মতিয়া চৌধুরী, হ বাবা, বর ভালো মানুষ হেয়, বহুত নেতা দেখছি হের মতো নেতা হয়না, মানুষ মন্ত্রি হইলে বর বর দালান বানায়, বহুত টেকার মালিক হয়, হের গ্রামের বাড়ি একদম সাধারন, কোন ডাট ফাট নাই, একবারে মাটির মানুষ, হের মত মন্ত্রি দেশে আর হইবোনা। তয় হেরে লইয়া একটা কথা মনে পড়ে গেল।

কি কথা বলেল তো?
হের শ্বশুরের নাম আছিরো কালা মৌলবি, আমাগো পাশের গ্রাম, বানেশ্বর ইউনিয়ন, ধারমিক পরিবার, হের জামাই নামটা জানি কি আছিলো… পাশ থেকে চাচি বললো বজলু মিয়া, চাচাও বললো হ বজলু মিয়া, মতিয়া আপারে বিয়া কইরা বাড়িতে আইলো আমরাও বৌ দেখতে গেলাম, হের বাপেতো বৌ ঘরে তুলবো না, রাজনীতি করা মাইয়া বৌ হিসাবে মাইন্যা নিবোনা, মেয়েরা কেমলে রাজনীতি করে, ঘরে উঠতেই দিলোনা পরে কয়দিন স্বজনগো ঘরো বেড়াইয়া ঢাকা চইলা গেলো।

চাচা কোন ঘটনায় বেশি অবাক হয়েছেন আপনি??
বেশি দিন আগের কথা না পাহাড় ধসের কয়দিন পর বাসায় একজন ফকির খাওয়াই ছিলাম। খাইতে খাইতে বৃষ্টি শুরু হওয়াতে তার সাথে আলাপ করছিলা, আর টিভি দেখছিলাম, ফকির কইয়া উঠলো হের বাসায় দুটা টিভি আছে আমারটা থেকে বড়, জানতে চাইলাম বাসা কই, কইলো পর্যটন এলাকা, নিজের বাড়ি, হের ৩০ ডিশিম জায়গা আছে, হুইন্যা আমিতো দরো হইয়া গেছি, এ কেমন ফকিরে আমি খাওয়াইলাম, কষ্টও পাইছি আর হাসছিও অনেক, আপনের চাচি কইছিলো চলেন হের বাসায়া গিয়া আমরা খাইয়া আসি, কেন যে মানুষ ভিক্ষা করে বুঝিনা !

রাঙামাটিই কি থেকে যাবেন??
না না এহানে থাকুমনা,এই বছরি নিয়ত করছি একবারে চলে যামু, এহানে পশাইতে পারতাছি না, রত বল কইম্যা যাইতাছে, কেমনে চলমু জানিনা।

সরকার কেমন দেশ চালাইতাছে??
এইডা আমি কমনে কমু, কইলে ভেজাল লাগবো, আমি গরিব মানুষ এগুলা আমগো মুখে মানায় না।

আপনার ভবিষ্যত নিয়ে কি ভাবেন?
এইডা ভাবলেই চোহে আন্ধার দেহি, জানিনা কি হইবো, আল্লাহ ভরসা।

শেষে একটা কথা কন, এ দেশের ভবিষ্যত কি??
আমি সাদারণ মানুষ এগুলা আমারে জিগান কেন? আমি কি এগুলা বুঝি…..আর বিরবির করে বললেন, হয়তো আমার মত, আল্লাহ ভরসা।

( কথোপকথনের বাস্তবিক শব্দই হুবহু অনুসরণ করা হলো, বানান ভ্রান্তি না খোঁজান বিনীত অনুরোধ রইলো……সম্পাদক)

আরো দেখুন

নানিয়ারচরে দুই ইউপিডিএফ কর্মীকে গুলি করে হত্যা

‘দলত্যাগ’ করে ইউপিডিএফ-এ যোগ দেয়ার ‘অপরাধে’ দুই কর্মীকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

seventeen − ten =