নীড় পাতা / ফিচার / খোলা জানালা / একজন নিরুপ্রভা ত্রিপুরা : এ এক অন্য গল্প….

একজন নিরুপ্রভা ত্রিপুরা : এ এক অন্য গল্প….

লেকের পাড় জুড়ে মানুষের ভীড়। এপারে ভীড়টা আরো বেশি। দর্শক সারি ঘোষনা মঞ্চ সব যে এ পাশেই। একটু সামনে দাঁড়িয়ে উৎসুক জনতার মত আমাদেরও চোখ আটকে আছে লেকের জলে। নৌকা বাইচ চলছে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে। ঠিক এই মুহূর্তে দর্শকসারির উত্তেজনা এখন অব্দি সব বিভাগের নৌকা বাইচকে ছাড়িয়ে গেছে। এক্ষুনি যে শেষ হলো নৌকা বাইচে নারী প্রতিযোগীদের যুদ্ধ। ফলাফল ঘোষণাও শেষ। লেকের জলে নারীদের জয়ের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে দর্শক সারিতে। উৎসুক জনতার ভীড়ে চোখ কাড়লো সত্তরর্ধো এক নারী। প্রথম নজরে খেয়ালই করিনি বয়স কত হতে পারে। চোখ আটকে গেছে তার আনন্দ নৃত্যে তার ভাঙা দাঁতের ভুবনজয়ী হাসিতে। ঘাটের পাড় থেকে উঠে গিয়ে নিচে নামিয়ে আনলাম তাকে। চলেন গল্প করি। তিনিও সানন্দে রাজি।
-জানতে চাইলাম পিসি কেন আসছেন এখানে?
-ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে বলে আমি না এলে হবে নাকি। সারাবছরতো এই জন্যই অপেক্ষা করি। এইটা উৎসব !
এইটা যে তার জন্য কতবড় উৎসব তার চোখ মুখে স্পষ্ট! গল্প করতে করতেই জানা গেলো তার নাম তার জীবন সংসার।
তবে যা জানলাম তা শুনে মজবুত হচ্ছিলো পায়ের নিচের শেকড়।
নিরুপ্রভা ত্রিপুরা। রাঙামাটি জেলার বালুখালি ইউনিয়নের কেইল্লামুড়া গ্রামের বাসিন্দা। মা বাবা দুজনই ছিলেন কেল্লামুরার মেম্বার। সাত বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় নিরুপ্রভা। তবুও কি প্রচন্ড চঞ্চল আর ডানপিঠে তিনি ছিলেন তা তার এই বয়সেও স্পষ্ট। বিয়ে হয়ে গেছে কম বয়সেই। স্বামী কি করে জানতেই বললো
-স্বামীরেও ডুবাই দিছি!
-অবাক হলাম! মানে কি!
স্বামী মারা গেছে বহু বছর।অদ্ভুদ চঞ্চলতায় জীবনের ঘানি টানা এই মানুষটা কি সাবলীল ভাবে উত্তর দিয়ে দিলো প্রিয় মানুষটার না থাকার। ব্যাথা বুঝি এমনই হয়!
স্বামী হারানো নিরুপ্রভা পিসি ২ ছেলে ২ মেয়ের জনক। মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। এক ছেলে সাথে আছেন আছেন ছেলের বঊও। নিজেই জুম করেন এক এক সিজনে এক এক ফলের চাষ করেন।বাজারে বিক্রয় করেন। এভাবেই চলে সংসার।
-জানতে চাইলাম, পড়াশোনা করেননি?
-করতেতো চেয়েছিলাম।
-তাহলে?
-আমার অংক করতে ভালো লাগতোনা। ক্লাশ থ্রীতে যখন পড়ি অংক করতে পারিনি বলে স্যার দুই হাতের মধ্যে বেত দিতে অনেকগুলো বারি দিছে। কাঁদতে কাঁদতে সেদিন বাড়ি ফিরছি। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিছি আমি আর স্কুলে যাবোনা। আমার বাবা মা-ই আমাকে কখনো মারলো না। সে মারবে কেন।
–আমার কেবলই হাসি পাচ্ছিলো। একটা সত্তরর্দ্ধো মানুষ কি করে এত মজা করে কথা বলতে পারে!
একটু আগেই হয়ে যাওয়া মহিলা নারী নৌকা বাইচ প্রতিযোগীতার বিজয়ী দল তার এলাকার দল। কেইল্লামুরা’র নারী দল।
-কেমন লাগছে পিসি?
-কেমন লাগবে মানে! আরেহ এটাতো আমারই দল। ওদের কে আমিইতো শিখাই।
-তার মানে আপনি নৌকাও চালাতে পারেন!
-এই মেয়ে তুমি আমারে চিনলাই না। আমার কত কত পুরষ্কার জানো! কত মেডেল। কত কত টাকা পাইছি আমি। কলসি টিভি আরো কত কি পাইছি আমি!
-আপনিও নৌকা বাইচ করতেন নাকি?
-শোন মেয়ে আমি হলাম এই তল্লাটের প্রথম মেয়ে যে নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করেছিলো।
রীতিমত থতমত খেয়ে গেলাম। এমন একজন মানুষের সাথে গল্প করছিলাম আমি এতক্ষন। অথচ কেবল তার উন্মাদনা দেখেই যখন তাকে পাঁজকোলা করে ধরে আনছি তখন কেবল এটুকুই জানি উনি এমন একজন যার সান্নিধ্য পাওয়া যাবে প্রাণের উন্মাদনা। অথচ তিনি এমন একজন!!
নিজের প্রতি খানিকটা গর্ববোধও হচ্ছিলো,আহ্ কি রতেœ চোখ বেঁধেছি!
গল্পের স্পৃহা বেড়ে গেছে। সাথে সার্থক আমি।
জানা গেলো, বয়স হয়েছে বলে এখন আর নিজে চালানোর শক্তি নেই। কিন্তু নিজের ছেলের বউকে শিখিয়ে পড়িয়ে দক্ষ করে তুলেছে নৌকা বাইচের জন্য। গ্রামের অনেক মেয়েকেও শিখিয়েছে নিজেই। নিজের আছে দু দুটো নৌকা। বড় নৌকোটা নিয়ে বউমাকে দলনেতা বানিয়ে প্রতিবছর দল নিয়ে হাজির হয়ে যায় নিরুপ্রভা ত্রিপুরা। কেবল হাজিরই নয় জিতে গিয়ে আনন্দনৃত্যে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরেন।
সময় শেষ হয়ে আসছে। দল থেকে ডাক আসছে।পুরষ্কার নেয়ার সময় হয়েছে।
ছাড়তে ইচ্ছে করছিলো না মানুষটাকে। কিন্তু তারওতো তাড়া আছে। যেতে যেতে দাওয়াত দিয়ে গেলেন তার বাড়িতে যেতে। যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে তার বাড়ি।পুরো পাড়া ঘুরিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে গেলেন তিনি।
ঠিক উঠার সময় যে কথাটা বললেন তাতেই কেমন যেন থমকে গেলো ভেতরটা।
-‘এভাবে যতœ করে আগে কেউ বলেনি আমার সাথে কথা,শোনেনিও। তুমি অনেক ভালো। আমার বাড়ি এসো কিন্তু অবশ্যই…’
একজন নিরুপ্রভা ত্রিপুরা আমাদের অহংকার আমার গর্ব। নারী শক্তির প্রতীক। অভাব আছে অনটন আছে অথচ কোন অভিযোগ নেই! আশ্চর্য এক ভালোলাগার মানুষ। অথচ কজন চিনি আমরা তাকে! আমরা কেবল তাদেরই চিনি যারা ঢোল বাজাতে জানে।

মানুষটার সাথে আর কখনো আমার দেখা হবে কিনা আমি জানিনা, কিন্তু আমি আমার সবটুকু অর্জন দিয়ে চাইবো এমন প্রাণসঞ্জীবনী উদ্যমী একজন মানুষ ভালো থাকুক ভালোবাসা ছড়াক আরো অ-নে-কগুলো বছর…………একটা অদ্ভুদ ঘোর লাগা মুহুর্ত সাথে নিয়ে মাথায় ঘুরছিলো কেবলিই, বেঁচে থাকতে বাঁচার মত করে বাঁচতে খুব বেশি কিছু দরকার হয়না, দরকার হয় স্বচ্ছতার, ভালোবাসার, ভালোবাসতে পারার….

আরো দেখুন

ক্যান্সারের কাছেই হেরে গেলেন সাংবাদিক মোস্তফা কামাল

দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন রাঙামাটির সাংবাদিক, বিশিষ্ট …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 × 5 =