নীড় পাতা / পাহাড়ের রাজনীতি / আতঙ্ক বাড়ছে পাহাড়ে

আতঙ্ক বাড়ছে পাহাড়ে

আবারো আতঙ্ক বাড়ছে পাহাড়ে। কোথায় কখন কার লাশ পড়ে সেই ভয়-আতঙ্কই যেনো তাড়া করে ফিরছে পাহাড়ের মানুষকে। সম্প্রতি পাহাড়ে আবারো বেড়েছে খুন-গুম-হত্যা। প্রতিদিন কারো না কারো রক্তে লাল হচ্ছে পাহাড়ের সবুজ জনপথ। শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি পার হতে না হতেই আবারো সহিংস হয়ে উঠেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো। যে আশা নিয়ে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল সেই শান্তি এখনো পায়নি পাহাড়ের সাধারণ মানুষ। পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের কারনে প্রতিনিয়ন মানুষকে চাঁদা দিয়ে ব্যবস্যা করতে হচ্ছে আর হানাহানি লেগে আছে বলে মনে করছেন সাধারন লোকজন। যত শীঘ্রই পাহাড়ের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা যাবে তত দ্রুতই পাহাড়ে শান্তি ফিরবে বলে মনে করেন শান্তি প্রিয় সাধারন লোকজন।

গত বছর ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি অনুষ্ঠানে রাজধানীতে ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ভবনে এক সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(জেএসএস) সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা বলেছিলেন চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে পাহাড়ে আগুন জ্বলবে। তাঁর এই ঘোষনার পর থেকে পাহাড়ে আবারো শুরু হয় হত্যার রাজনীতি।

চলতি বছরের শুরু থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ১০/১২ জনের মত নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। নিহতদের মধ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’ এবং আওয়ামীলীগের এর দলের লোকজন। তবে জাতীয় ও আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের হত্যা পাল্টা হত্যার ঘটনা ঘটলেও একেবারে চুপচাপ রয়েছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পাহাড়ের প্রধান আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস। তাদের কোনো নেতাকর্মী চলতি বছর হত্যার স্বীকার না হলেও প্রতিপক্ষের অভিযোগের স্বীকার হয়েছেন। কিন্তু প্রতিবারই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। ইতোমধ্যে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউপিডিএফ সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমাকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করা হয়। নানিয়ারচরের চিরঞ্জীব দর্জিপাড়া এলাকায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গুলি করা হয় তাকে। একই দিন বিকেলে ৫ ডিসেম্বর বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রামচরণ মারমা ওরফে রাসেল মারমাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত। ওই দিনই রাত ৮টার দিকে জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সহ-সভাপতি অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জুরাছড়ি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সহ-সভাপতি অরবিন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদ করায় গত ৬ ডিসেম্বর রাতেও সহিংসতার আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। রাঙামাটি জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ঝর্ণা খীসাকে (৫৫) ওদিন মধ্যরাতে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। একই সময়ে তার পরিবারের সদস্য জিতেন্দ্র লাল চাকমা (৬৫) ও রমন কৃষ্ণ চাকমাকেও (২৮) কুপিয়ে জখম করা হয়।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনিল নামের একজনকে হত্যা করা হয়। খগড়াছড়িতে (ইউপিডিএফ) নেতা মিঠুন চাকমা, বাঘাইছড়ির বিজয় চাকমা ও তপন চাকমা, গত ১৫ এপ্রিল সমাজ কর্মী সূচি বিকাশ চাকমা, ২২ এপ্রিল খগড়াছড়িতে পানছড়ির (ইউপিডিএফ) সমর্থিত নতুন কুমার চাকমা। ৩ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএনলারমা) সহ-সভাপতি এডভোকেট শক্তিমান চাকমা প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন। সর্বশেষ ৪ মে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান এড. শক্তিমান চাকমাকে হত্যার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই তার দাহক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে সাধারন মানুষের উপরে বেপরোয়া গুলিবর্ষনে ইউপিডিএফ-গনতান্ত্রিক এর শীর্ষ নেতা আহ্বায়ক তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ অন্তত: ৫ জন নিহত এবং আরো অন্তত: ৯ জন আহত হয়েছে। নিহতরা হলেন, ইউপিডিএফ এর আহ্বায়ক তপন জ্যোতি চাকমা, সজীব চাকমা, সেতুলাল চাকমা, সজল চাকমা ও টনক চাকমা। এসব ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয় না। পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করলেও এখনো পর্যন্ত তার কোনো সুরাহা পাওয়া যায়নি।

শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করলেও এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’। এরপরই শুরু হয় পাহাড়ে রক্তের খেলা। ২০০৭ সালে ‘জনসংহতি সমিতি’ থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)’। এতদিন এই দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে গেলেও সবশেষ গত বছরে আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক সশস্ত্র দল ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)’। এই চার সংগঠনের ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দের কারণে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। গত বছরে আত্মপ্রকাশ করা পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল ‘ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা (বর্মা) পাঁচ মাসের মাথায় ( ৪ মে) প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর মূখমাত্র নিরন চাকমা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের ঘটনার সাথে আমাদের দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি আরো বলেন, যারা তাদের সৃষ্টি করেছেন আবার তাদের প্রয়োজনে তাদের হত্যা করতে পারে বলে মনে হচ্ছে। ইউপিডিএফ বারবার বলে আসছিল ইউপিডিএফ-গনতান্ত্রিক এর কারনে পাহাড়ে হত্যার রাজনীতি শুরু হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউই হত্যাকান্ডের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হন নি।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির জানান, ‘রাঙামাটির আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তবে দুইদিনের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে আটক বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয় নি। থানায় এখনো পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করে নি।

আরো দেখুন

পাহাড়ে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যবহার না করার আহ্বান

‘পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সংঘাতপূর্ণ অবস্থার কারণে একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিনই পড়ছে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

two × three =